‘জীবনের প্রথম ভোট শান্তিমত দিতাম পারিয়ার, অউটাউ ভালা লাগের’
উৎসবে আনন্দে শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৪:৩৮:০১ অপরাহ্ন
নূর আহমদ :
কোন ধরনের সহিংসতা বা অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই সিলেট বিভাগের ১৯ আসনে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সিলেটের গ্রাম, শহরতলী ও নগরীর বিভিন্ন কেন্দ্রের পাশে জনতার ভিড় ছিল লক্ষণীয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও ছিলো চোখে পড়ার মতো। সিলেট ছাড়াও হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জেও দিনভর শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে চলে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত। অন্যদিকে জাল ভোটের অভিযোগে কোম্পানীগঞ্জের একটি কেন্দ্রের ৩ জন ভুয়া ভোটারকে আটক করা হয়।
সরজমিনে নগরীর বিভিন্ন ভোট কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, সকাল ৭টা থেকে মানুষজন কেন্দ্রে আসতে শুরু করেন। কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের সারিবদ্ধ হয়ে ভোট দিতে দাঁড়াতে দেখা গেছে। তবে শীতের দিন হওয়ায় সকালে ভোটার উপস্থিতি ছিল কিছুটা কম। সকালে নগরীর পিটিআই স্কুলে তানিয়া নামের এক তরুণী বলেন, আমি এবার আমার জীবনের প্রথম ভোট দিলাম। ভোট দিতে এসে খুব ভালো লাগল।
নগরীর হাতিমবাগ স্কলারস স্কুল কেন্দ্রে প্রথমবারের মতো ভোট দিয়ে কাশফা রাজ্জাক চৌধুরী নামের একজন নতুন ভোটার বলেন, ঈদ উৎসবের মতো ভালো লাগছে-যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
সকাল সাড়ে ৯টায় ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের মুক্তিরচক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভোটার ও মদনমোহন কলেজের পলিটিক্যাল সায়েন্স অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মো: সজিব জানান, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ভোট দিতে পারিনি। ‘ইবার জীবনের প্রথম ভোট শান্তিমত দিতাম পারিয়ার, অউটাউ ভালা লাগের।’ নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাত আইয়া দেশ সুন্দর করি চালাইব, জিনিসপত্রের দাম কমাইব-এই প্রত্যাশা সজিবের।
সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নগরের মদন মোহন কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ভোটারের উপস্থিতি বেশ কম। দুই-একজন করে ভোটার এসে ভোট দিচ্ছেন। এই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আওয়াল আহমদ জানান, এখানে মোট ২ হাজার ৯৩৩ জন ভোটারের মধ্যে প্রথম দুই ঘণ্টায় ভোট দিয়েছেন ১৫৪ জন।
অন্যদিকে, সকাল ৮টায় নগরের সারদা হল কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। পুরুষের চেয়ে নারী ভোটারের উপস্থিতিই বেশি দেখা গেছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনেক নারীকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
তোপখানা এলাকার ভোটার জাহানারা বলেন, ভোটের পরিবেশ খুব ভালো। কাজিরবাজার এলাকার বাসিন্দা শিউলি আক্তার বলেন, সকালে ঝামেলা কম হবে মনে করে এসেছিলাম। এখন দেখি দীর্ঘ লাইন।
সকাল সাড়ে ৮টায় কাজিটুলা কিশোরীমোহন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর হায়াতুল ইসলাম আকঞ্জি ও তাঁর ছেলে ফারহান। ফারহান জানান, এবারই প্রথম তিনি শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিলেন। এজন্য তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন। ভোটার হলেও এর আগের ভোটগুলোতে তিনি ভোট দিতে পারেননি।
সকালে কদমতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে এসেছিলেন ৮০ বছরের বৃদ্ধা তৈয়বুন্নেছা। তিনি বলেন, ঝামেলা কম ভোট দিয়ে ভালোই লেগেছে।
সিলেট মহানগর জামায়াতের আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলামসহ দলের নেতাা-কর্মীদের সাথে নিয়ে সকাল ৮টায় শিবগঞ্জ স্কলার্সহোম কেন্দ্রে ভোট দেন সিলেট-১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান। অন্যদিকে, জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী ও মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদীকে সাথে নিয়ে সকাল ১০টার কিছু আগে শারদা হল কেন্দ্রে ভোট দেন এই আসনের বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর। ভোট দেওয়ার পর তাঁরা দুজনই নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
বেলা ১১টায় নগরীর আম্বরখানা গার্লস হাইস্কুলের পুরুষ ভোটার মো. দিদারুল ইসলাম বলেন, এবার মনে হলো শান্তিতে ভোট দিয়েছি। ভয় ভীতি নেই। আমরা এমন ভোটই চেয়েছিলাম।
সকাল ১০টায় সিলেট ১ আসনের কান্দিগাও ইউনিয়নের বাদাঘাট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় ভোট পড়ে প্রায় ২৫ ভাগ। প্রিসাইডিং অফিসার মো: রায়েছ তালুকদার জানান, তার আসনে শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সাড়ে ১১টায় হাটখোলা ইউনিয়নের ভাদেশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উমাইরগাঁও, জইনকারকান্দি, পাটিমুরা গ্রামের ভোটাররা ভোট প্রদান করেন। প্রিসাইডিং অফিসার বায়েজিদ ভুইয়া জানান, ভোটাররা স্বত:স্ফূর্ত ভোট দিতে আসেন। শান্তিপূর্ণ ছিলো পরিস্থিতি।
দুপুরের দিকে সিলেটে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে সিলেটের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি বলেন, সিলেট অঞ্চলে সাধারণত মানুষ সকালে একটু দেরিতে ভোটকেন্দ্রে আসেন। সেই তুলনায় বিভিন্ন কেন্দ্রে এখন পর্যন্ত যে ভোটের হার দেখা গেছে, তা মোটামুটি সন্তোষজনক। দিন শেষে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের বেশি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
দিনভর বিভিন্ন কেন্দ্রে সরেজমিন অবস্থান ও খোঁজ নিয়ে বড় ধরনের কোনো সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। বিকেল চারটার পর থেকে সকলের নজর ফল গণনা দিকে। সিলেটের গ্রাম, শহরতলী ও নগরীর বিভিন্ন কেন্দ্রের পাশে জনতার ভিড় লক্ষ্যণীয়ভাবে দেখা গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তৎপর ছিল।
অপরদিকে শান্তিপূর্ণভাবে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলে এই ভোটগ্রহণ। উপজেলায় ভোটে অনিয়ম ও জালিয়াতির দায়ে ৩ জন ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে ১ জনকে আটক করা হয়। ভোট চলাকালীন বর্ণি, কাঁঠালবাড়ি, চাটিবহর ও জালিয়ারপাড় কেন্দ্র থেকে তাদেরকে আটক করা হয়। এই অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়া উপজেলার কোথাও বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
আটককৃতরা হলেন- চাটিবহর গ্রামের আজির উদ্দিনের ছেলে মাহবুবুর রহমান, বর্ণি মাঝপাড়া গ্রামের সাঈদ আলীর ছেলে ফাহিম, কাঠালবাড়ি গ্রামের ইসহাক উল্লার ছেলে সাদেক মিয়া এবং জালিয়ারপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলার দায়ে চিকাডহর গ্রামের মৃত আব্দুল মালিকের ছেলে আজমান আলীকে আটক করা হয়।
এদিন সকাল থেকে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হতে থাকেন। ধীরে ধীরে ভোটারদের লাইন দীর্ঘ হতে থাকে। দিনের শুরুর দিকে মহিলা ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে পুরুষ ভোটারদের উপস্থিতিও। ১২টার মধ্যে প্রায় সব সেন্টারে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ ভোটগ্রহণ শেষ হয়ে যায়। বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় নারী-পুরুষ তরুণ বয়ো:বৃদ্ধ সকলেই ভোট দিতে কেন্দ্রে চলে আসেন। তবে বেলা ২টার পর থেকে অনেক সেন্টারে ভোটারদের উপস্থিতি তেমন চোখে পড়েনি। উপজেলার ১ লাখ ২৫ হাজার ৬৩৭টি ভোটের মধ্যে ৬৯ হাজার ১১৯টি ভোট কাস্ট হয়েছে। ভোট গ্রহণের হার ছিল ৫৫.০১ শতাংশ।
এদিন বিকেলে উপজেলার খাগাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোটকেন্দ্র দখল করে ভোটচুরির গুজব উঠলেও তার সত্যতা পাওয়া যায়নি। সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, খাগাইল সেন্টারে জাল ভোট দিতে গিয়ে একজন অপ্রাপ্ত বয়স্ক এক ছেলে আটক হয়। পরে স্থানীয়রা সেখানে গিয়ে মুচলেকা দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নেন। এই ঘটনা ভিন্নভাবে ছড়ানো হয়।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ রবিন মিয়া জানান, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। কোথাও কেন্দ্র দখল বা জোর করে ভোট দেওয়ার ঘটনা ঘটেনি। জাল ভোট দিতে যাওয়ায় ৩ জনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া বিশৃঙ্খলার দায়ে ১ জনকে আটক করা হয়েছে।



