হোয়াইট হাউসের অভিনন্দনবার্তা ও বাংলাদেশের আগামীর চ্যালেঞ্জ
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৪৫:০১ অপরাহ্ন
আরণ্যক শামছ :
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্টের পাঠানো অভিনন্দন বার্তাটি এখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সর্বাধিক আলোচিত বিষয়। অভিনন্দন পত্রটির প্রতিটি শব্দ ও যতিচিহ্ন যখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের টেবিলে ব্যবচ্ছেদ করা হচ্ছে তখন প্রজ্ঞাবান মহলে একটি মৌলিক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। এটি কি কেবলই রাষ্ট্রাচারের চিরাচরিত সৌজন্য নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর কৌশলগত সঙ্কেত?
আন্তর্জাতিক কূটনীতির ময়দানে কোনো অভিনন্দন পত্রই নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়। এখানে প্রতিটি বিশেষ্য এবং বিশেষণ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্বাচন করা হয়। প্রতিটি বাক্য বহন করে আগামী দিনে দুই দেশের সম্পর্কের এক সূক্ষ্ম অথচ অমোঘ রূপরেখা।
নতুন নেতৃত্বের প্রতি পাঠানো এই চিঠির গঠনশৈলী প্রথাগত কূটনৈতিক কাঠামোর ভেতরে অবস্থান করেও একটি ভিন্নতর আবহ তৈরি করে। চিঠির প্রথম বাক্যেই ঐতিহাসিক বিজয় শব্দবন্ধটির প্রয়োগ কেবল সৌজন্যের প্রকাশ নয় বরং এটি নবগঠিত সরকারকে দ্রুত আন্তর্জাতিক বৈধতা প্রদানের একটি সুচিন্তিত পদক্ষেপ। যখন কোনো নতুন সরকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ কিংবা নানামুখী আস্থার সংকটের মধ্য দিয়ে নিজের যাত্রা শুরু করে তখন বৈশ্বিক পরাশক্তির এমন সরাসরি স্বীকৃতি তার অবস্থানকে দৃশ্যত দৃঢ় করে তোলে। ফলে এখানে অভিনন্দন বার্তার ভাষাটি কেবল শব্দমালা নয় বরং এটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে কাজ করছে। এটি এমন এক সময় যখন রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং প্রতিটি আন্তর্জাতিক সমর্থন নতুন সরকারের জন্য অক্সিজেনের মতো কাজ করছে।
তবে এই অভিনন্দন বার্তার গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায় বর্তমান সরকারের সামনে এক বিশাল উত্তরাধিকারের বোঝা চেপে বসেছে। ডক্টর ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে সময় পার করেছে সেই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের প্রেক্ষাপটে একটি রাষ্ট্রের সরকার পরিবর্তিত হলেও সেই রাষ্ট্রের পূর্ববর্তী অঙ্গীকারগুলো মুছে যায় না।
নতুন প্রধানমন্ত্রী যখন শপথ নিচ্ছেন তখন তার টেবিলে কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয় বরং ইউনূস সরকারের রেখে যাওয়া সেই সব কৌশলী চুক্তির ফাইলগুলোও জমা হয়ে আছে। এই নতুন সরকারকে এখন এমন এক সংকটের মুখোমুখি হতে হবে যেখানে একদিকে থাকবে পূর্ববর্তী সরকারের আইনি দায়বদ্ধতা এবং অন্যদিকে থাকবে নিজস্ব রাজনৈতিক ইশতেহার। এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করাটাই হবে নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর জন্য প্রথম ও প্রধান অগ্নিপরীক্ষা। ডক্টর ইউনূসের সময়ে করা প্রতিরক্ষা চুক্তি কিংবা বাণিজ্যিক রোডম্যাপগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যদি নতুন সরকার সামান্যতম শিথিলতা প্রদর্শন করে তবে ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্কের ফাটল শুরু হতে পারে। আবার যদি অন্ধভাবে সেই পথেই হাঁটা হয় তবে দেশের ভেতর জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলো প্রশ্ন তুলবে যে এই সরকার কি আসলে সার্বভৌম কি না। এই নেভিগেশন বা কূটনীতির পিচ্ছিল পথে পথচলা অত্যন্ত দুরূহ।
সরকারকে প্রতিটি পদক্ষেপ নেওয়ার আগে এটি নিশ্চিত করতে হবে যে তারা কোনো নির্দিষ্ট বলয়ের আজ্ঞাবহ হয়ে পড়ছে না। নিগোশিয়েশনের টেবিলে নতুন সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা কেবল ইউনূস সরকারের চুক্তিগুলোর রক্ষক নয় বরং তারা সেই সব চুক্তিতে জাতীয় স্বার্থের নতুন মাত্রা যোগ করার ক্ষমতা রাখে। যদি এই নিগোশিয়েশন ব্যর্থ হয় তবে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ এক ধরনের কৌশলগত পঙ্গুত্বের শিকার হতে পারে। এই পঙ্গুত্ব কেবল অর্থনৈতিক নয় বরং এটি রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণী স্বাধীনতার ওপর একটি বড় আঘাত হিসেবে দেখা দেবে।
ডক্টর ইউনূস সরকারের আমলে সই হওয়া বিভিন্ন সমঝোতা স্মারক বা মেমোরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিংগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে সেখানে জ্বালানি নিরাপত্তা থেকে শুরু করে সাইবার নিরাপত্তা পর্যন্ত বহুবিদ বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর অনেকগুলোই ছিল অত্যন্ত কারিগরি ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের যেখানে বিদেশের বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শকদের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। নতুন সরকারকে এখন প্রতিটি চুক্তির ধারা ও উপধারা বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে যে সেখানে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের কোনো গোপন বিসর্জন রয়েছে কি না।
যদি কোনো চুক্তিতে এমন শর্ত থাকে যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক স্বার্থের পরিপন্থী তবে তা পরিবর্তন বা নিগোশিয়েট করা হবে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। কারণ আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা বা সংশোধন করা অনেক সময় অর্থনৈতিক জরিমানার চেয়েও বেশি কূটনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলোর ঋণ প্যাকেজের সাথে যখন কোনো বিশেষ ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের সংশ্লিষ্টতা থাকে তখন সাধারণ সরকারগুলোর পক্ষে সেই বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বর্তমানে নতুন নেতৃত্বের সামনে এটি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে যা তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পালনে অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে।
এই পরিস্থিতির পরিণতি ও পরিণাম হতে পারে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং বহুমুখী। যদি নতুন সরকার মার্কিন প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয় তবে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মতো খড়্গ সরাসরি না আসলেও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন বা জিএসপি সুবিধার মতো বিষয়গুলো কৌশলে ঝুলিয়ে দেওয়া হতে পারে। মার্কিন কূটনীতিতে গাজর ও লাঠি বা ক্যারেট অ্যান্ড স্টিক পলিসি অত্যন্ত সুপরিচিত। তারা একদিকে যেমন সহযোগিতার হাত বাড়ায় তেমনি শর্তের বেড়াজালে রাষ্ট্রকে বন্দিও করে।
আবার অন্যদিকে প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করলে দেশের সামরিক অবকাঠামোতে মার্কিন প্রযুক্তির এমন এক আধিপত্য তৈরি হবে যা থেকে ভবিষ্যতে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। সামরিক সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ থেকে শুরু করে যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং কারিগরি জ্ঞান সবকিছুর জন্য তখন ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করতে হবে। এর ফলে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতি চিরদিনের জন্য একটি বিশেষ মেরুর দিকে হেলে পড়তে পারে যা আমাদের দীর্ঘদিনের জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির পরিপন্থী। এই একমুখী নির্ভরতা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির কারণ হতে পারে কারণ কোনো বড় শক্তি যখন অন্য কোনো দেশের সামরিক সরঞ্জামের প্রধান যোগানদাতা হয়ে ওঠে তখন তারা সেই দেশের পররাষ্ট্রনীতিকেও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে।
আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া এক্ষেত্রে অত্যন্ত তীব্র হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারত এবং উত্তর পূর্বের শক্তি চীন এই নতুন সমীকরণকে সন্দেহের চোখে দেখবে। ভারত দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় প্রভাব বিস্তারকারী শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। দিল্লির নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি তাদের সাত বোন বা সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলোর জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশে যে ভারতবিরোধী মনোভাব তুঙ্গে রয়েছে তার বিপরীতে যদি মার্কিন আধিপত্য বাড়তে থাকে তবে ভারত বিষয়টিকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে দেখবে। অন্যদিকে চীন দেখবে যে তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরআই প্রকল্পে বাংলাদেশ ধীরগতি অবলম্বন করছে কি না। চীনের কাছে বাংলাদেশ একটি বড় বিনিয়োগের বাজার এবং তাদের কৌশলগত মুক্তোর মালা বা স্ট্রিং অফ পার্লস নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এর ফলে স্বল্প মেয়াদে আমরা দেখব প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং দীর্ঘমেয়াদে দেখব বাংলাদেশের মাটিতে এক ধরনের প্রক্সি রাজনীতির চর্চা। বড় শক্তিগুলোর এই ক্ষমতার লড়াইয়ে বাংলাদেশ যদি নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে না পারে তবে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। এর প্রভাব সরাসরি পড়বে আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যে যেখানে চীন ও ভারত উভয়ই বড় অংশীদার।
জনগণের প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি এখানে সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং বিস্ফোরক হতে পারে। বাংলাদেশের মানুষ জন্মগতভাবেই স্বাধীনচেতা এবং তারা বাইরের কোনো হস্তক্ষেপ সহজে মেনে নেয় না। গত কয়েক বছরে ভারতবিরোধী মনোভাব যেভাবে সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে গেঁথে গেছে ঠিক একই রকম বিরূপ প্রতিক্রিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও তৈরি হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই অভিনন্দন বার্তায় যখন প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কথা বলা হয় বা উচ্চমানের সামরিক সরঞ্জামের প্রলোভন দেখানো হয় তখন সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে এসবের বিনিময়মূল্য কী। মানুষ যখন দেখবে যে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে কিন্তু সরকার বিদেশের সাথে সমর সাজ সজ্জাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে তখন সেই ক্ষোভ রাজপথে নেমে আসতে সময় নেবে না। আমেরিকার এই অতি আগ্রহকে জনগণ এক ধরনের নয়া উপনিবেশবাদ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী যে অ্যান্টি আমেরিকা বা আমেরিকা বিরোধী মনোভাব ছড়িয়ে পড়ছে তার ছোঁয়া বাংলাদেশকেও স্পর্শ করছে। গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন থেকে শুরু করে ন্যাটোর সম্প্রসারণবাদ, ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ কিংবা কানাডা ও পানামার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কের টানাপোড়েন প্রতিটি ঘটনাই বিশ্ববাসীর মনে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার তৈরি করেছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তার আঁচ বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজও সরাসরি টের পাচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী অ্যান্টি আমেরিকা মনোভাবের যে জোয়ার বইছে তার সাথে বাংলাদেশের পরিস্থিতি মিলিয়ে দেখলে এক ভয়ংকর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। গ্রিনল্যান্ডের মতো বিশাল ভূখণ্ড কিনে নেওয়ার মার্কিন প্রস্তাব যেভাবে ডেনমার্ক ও স্থানীয় মানুষের মনে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল তা থেকে বোঝা যায় যে ছোট বা কম শক্তিশালী দেশগুলোর ভূমি বা সম্পদের ওপর বড় শক্তির কুনজর চিরকালই ছিল।
পানামা খালের ওপর আধিপত্য বজায় রাখতে গিয়ে ওয়াশিংটন যেভাবে পানামাকে কলম্বিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল সেই ইতিহাস আজও ল্যাটিন আমেরিকার মানুষের মনে ঘৃণার জন্ম দেয়। বাংলাদেশেও যদি ইন্দো প্যাসিফিক কৌশলের নামে কোনো বিশেষ উপকূলীয় সুবিধা বা দ্বীপ ব্যবহারের প্রশ্ন ওঠে তবে তা দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রচণ্ড ভীতি তৈরি করবে। ইউক্রেন যুদ্ধের মাধ্যমে ন্যাটোর যে সম্প্রসারণবাদী চেহারা ফুটে উঠেছে তাতে বিশ্ববাসী দেখেছে যে প্রক্সি যুদ্ধের ময়দান হয়ে ওঠা কোনো দেশের জন্য কতটা ধ্বংসাত্মক হতে পারে। বাংলাদেশের মানুষ কোনোভাবেই চাইবে না যে তাদের প্রিয় মাতৃভূমি কেবল কোনো বিশ্বশক্তির কৌশলগত মানচিত্রের একটি বিন্দুতে পরিণত হোক।
দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার কথা চিন্তা করলে দেখা যায় আমেরিকার আধিপত্যের বিরুদ্ধে যদি একবার গণ অসন্তোষ তৈরি হয় তবে তা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে এক বড় ধরনের মেরুকরণ ঘটাবে। কমিউনিস্ট পার্টি ও অন্যান্য বামপন্থী দলগুলোর পুনর্জাগরণের পথ প্রশস্ত হবে। ছাত্র ইউনিয়নের মতো ক্যাডারভিত্তিক সংগঠনগুলো আমেরিকা বিরোধী স্লোগান তুলবে। রাজনৈতিক দলগুলো তখন উন্নয়ন বা সু শাসনের বদলে বিদেশি শক্তির দালাল বনাম দেশপ্রেমিক তকমায় একে অপরের বিরুদ্ধে লড়বে। এতে করে রাষ্ট্রের প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে চলে যাবে।
ন্যাটোর প্রসারের ফলে ইউক্রেন যেভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে সেই ভয়ংকর উদাহরণ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে সতেজ। তারা কোনোভাবেই চাইবে না বাংলাদেশ ইন্দো প্যাসিফিকের নামে কোনো সামরিক জোটের সম্মুখ সারিতে চলে আসুক এবং নিজের ভূখণ্ডকে অন্য রাষ্ট্রের যুদ্ধের ময়দান হিসেবে ব্যবহৃত হতে দিক। যদি সরকার জনগণের এই পালস বুঝতে না পারে তবে স্বল্প মেয়াদে হয়তো তারা আন্তর্জাতিক সমর্থনে ক্ষমতায় টিকে থাকবে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তার নিজস্ব স্বকীয়তা ও নিরপেক্ষতা হারিয়ে ফেলবে। ভেনিজুয়েলা বা পানামাতে যেভাবে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বিদেশিদের খেলার পুতুলে পরিণত হয়েছে সেই একই ছায়া যদি বাংলাদেশের ওপর পড়ে তবে তা হবে আমাদের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের অর্জনের জন্য এক চরম অবমাননা।
বর্তমানে যেভাবে ভারতবিরোধী মনোভাব জনমনে গেঁথে আছে ঠিক একই রকম তীব্রতা নিয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধেও একটি মনস্তাত্ত্বিক দেওয়াল খাড়া হতে পারে। ভারতবিরোধিতার মূলে ছিল সীমান্তের হত্যা তিস্তার পানি বণ্টন ও অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে সরাসরি প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ। আমেরিকার ক্ষেত্রে সেই অভিযোগগুলো হবে সার্বভৌমত্ব হারানো সামরিক বলয় তৈরিকরণ এবং আকাশ সংস্কৃতি বা বাণিজ্যিক আগ্রাসন। এই দুই শক্তির মাঝখানে পড়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এক ধরনের অস্তিত্ব সংকটে ভুগবে। এক পক্ষ যখন বলবে দিল্লি দূরে যাও তখন অন্য পক্ষ বলবে ওয়াশিংটন ফিরে যাও। বিশ্ব রাজনীতিতে বর্তমানে যে পরিবর্তন আসছে যেখানে একক মেরু বা ইউনিপোলার ওয়ার্ল্ডের পতন ঘটছে এবং একটি মাল্টিপোলার বা বহুমুখী বিশ্বের উত্থান হচ্ছে সেই সময়ে কোনো একটি নির্দিষ্ট পরাশক্তির দিকে ঝুঁকে পড়া হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। গ্রিনল্যান্ড থেকে ইউক্রেন পর্যন্ত আমেরিকার যে আগ্রাসী রূপ বিশ্ব দেখছে তা বাংলাদেশের মানুষকেও সতর্ক করে তুলেছে।
বাংলাদেশের মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন তারা জানে যে বিদেশের সাহায্য বা অভিনন্দন বার্তা কখনোই নিঃস্বার্থ হয় না।
নতুন সরকারের সামনে এখন যে বড় চ্যালেঞ্জ তা হলো একটি স্বচ্ছ এবং শক্তিশালী জাতীয় সংসদীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেখানে প্রতিটি বৈদেশিক চুক্তি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচিত হবে। ডক্টর ইউনূসের আমলে হওয়া চুক্তিগুলো যদি অন্ধভাবে মেনে নেওয়া হয় তবে ভবিষ্যতে যখন ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটবে তখন পরবর্তী রাজনৈতিক পক্ষ একে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে। এতে করে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বারবার নষ্ট হবে।
তাই এখনই সময় একটি ‘ন্যাশনাল পলিসি অন ফরেন রিক্রুটমেন্ট’ তৈরি করা যা কেবল নির্দিষ্ট কোনো সরকারের নয় বরং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করবে। এই নীতিমালায় স্পষ্ট থাকতে হবে যে কোনো কৌশলগত বন্দর বা দ্বীপ কোনো বিদেশি শক্তিকে সামরিক ব্যবহারের জন্য দেওয়া হবে না এবং যে কোনো বড় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার আগে তার উপযোগিতা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। কেবল অভিনন্দন বার্তায় গদগদ না হয়ে সরকারকে চিঠির অন্তরালে লুকিয়ে থাকা কঠোর শর্তগুলো চিহ্নিত করতে হবে।
আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অবস্থান আরও জটিল হতে পারে। আফগানিস্তানে মার্কিন পরাজয় এবং সেখান থেকে বিশৃঙ্খল পলায়নের ছবি এশিয়াবাসীর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। মানুষের মনে একটি স্থায়ী ধারণা তৈরি হয়েছে যে আমেরিকা কেবল তার স্বার্থ ফুরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত পাশে থাকে। এই অবিশ্বাসের সংস্কৃতি যখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে তখন আমেরিকা সমর্থিত যে কোনো সংস্কার প্রকল্প বা অর্থনৈতিক প্রস্তাব মানুষ সন্দেহের চোখে দেখবে।
এটি সরকারের জন্য এক বড় বিড়ম্বনা হবে কারণ উন্নয়ন করতে গেলে বৈদেশিক সহযোগিতার প্রয়োজন আছে। কিন্তু সেই সহযোগিতার মোড়কে যদি কোনো আধিপত্যবাদী অ্যাজেন্ডা থাকে তবে তা দেশের অভ্যন্তরীণ সংহতি নষ্ট করবে। বর্তমানে যেভাবে ভারতবিরোধী বয়ান তৈরি হয়েছে তা সামাল দিতেই সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে এর ওপর যদি আমেরিকা বিরোধী জনমত যোগ হয় তবে সরকার পরিচালনা করা এক প্রকার অসম্ভব হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে এই বৈশ্বিক অ্যান্টি আমেরিকা মনোভাবের প্রভাব হবে অত্যন্ত গভীর। নতুন প্রজন্মের ভোটাররা যারা অনেক বেশি তথ্যনির্ভর তারা দেখছে যে সারা বিশ্বে কীভাবে নব্য উপনিবেশবাদ বা ডমিন্যান্ট কালচার মানুষের পরিচয় মুছে দিচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশে এক ধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটতে পারে যা শুরু হবে বিদেশিদের বর্জনের ডাক দিয়ে কিন্তু শেষ হতে পারে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতায়।
সরকার যদি এই তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা বুঝতে না পারে এবং তাদের সার্বভৌমত্বের অনুভূতিকে গুরুত্ব না দেয় তবে রাজপথের আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে। মনে রাখতে হবে যে রাজনৈতিক বৈধতা কেবল বিদেশ থেকে আসা অভিনন্দন বার্তায় অর্জিত হয় না বরং তা দেশের মানুষের মন থেকে আসতে হয়। অভিনন্দন বার্তাটি একটি সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি এক বিশাল দায়বদ্ধতার পাহাড় তৈরি করে রেখেছে যা পার হওয়া নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য এক দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ পথ।
এই অবস্থায় নতুন সরকারের সামনে পথ কী? প্রথমত ডক্টর ইউনূসের আমলে হওয়া চুক্তিগুলোকে পুনর্বিবেচনা বা রিভিজিট করার সাহস দেখাতে হবে। রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা মানে এই নয় যে জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া। যদি কোনো চুক্তি দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হয় তবে তা সংশোধনের জন্য নিগোশিয়েশন বা আলোচনা পুনরায় শুরু করতে হবে।
দ্বিতীয়ত কূটনীতিতে বহুমুখিতা আনতে হবে। কেবল ওয়াশিংটন বা দিল্লির ওপর নির্ভর না করে মধ্যপ্রাচ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। জাপানের মতো বন্ধু দেশ যারা বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন অংশীদার তাদের সাথে সম্পর্ক আরও গভীর করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত প্রতিরক্ষা কেনাকাটায় বৈচিত্র্য আনতে হবে যাতে কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর কারিগরি নির্ভরতা তৈরি না হয়। চতুর্থত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অভ্যন্তরীণ ফ্রন্টে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা। পররাষ্ট্র নীতি যেন কোনো বিশেষ দলের নীতি না হয়ে জাতীয় নীতি হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। সংসদে এই সব চুক্তি নিয়ে উন্মুক্ত বিতর্ক হওয়া উচিত যাতে জনগণ বুঝতে পারে তাদের সরকার কার স্বার্থে কাজ করছে।
সবশেষে বলা যায় এই অভিনন্দন পত্রটি কেবল একটি দাপ্তরিক চিঠি নয় বরং এটি বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন কূটনৈতিক অধ্যায়ের প্রবেশপথ। স্বল্পমেয়াদে আমরা হয়তো বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রস্তাব ও সামরিক সহযোগিতার সক্রিয়তা দেখতে পাব কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ নিজেকে একটি কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে কি না সেটিই দেখার বিষয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সামনে এখন বড় সুযোগ হলো কূটনীতিতে একটি নতুন আস্থার কাঠামো গড়ে তোলা।
সংসদীয় তদারকি এবং জনগণের সাথে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে বৈদেশিক নীতিকে আরও জনমুখী ও স্বচ্ছ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ যদি নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে এবং বৈশ্বিক চাপকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির সম্পদে রূপান্তর করতে পারে তবেই এই অভিনন্দন বার্তার সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যাবে। নচেৎ আমরা কেবল বড় শক্তির কৌশলী চালের দাবার ঘুঁটি হয়েই থেকে যাব আর আমাদের দীর্ঘ সংগ্রামের স্বাধীনতা পরিণত হবে এক সুন্দর অথচ করুণ ট্র্যাজেডিতে।
আমাদের ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে আত্মমর্যাদাহীন উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয় না আর জনগণের সম্পৃক্ততাহীন কূটনীতি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। তাই নতুন অধ্যায়ের সূচনায় আমাদের প্রতিটি শব্দ ও পদক্ষেপ হতে হবে অত্যন্ত সতর্ক ও দেশপ্রেমের আলোকে উজ্জ্বল। যে বাংলাদেশ একদিন তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ ঘুচিয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল সেই বাংলাদেশ যেন আজ কোনো কৌশলী অভিনন্দন বার্তার আড়ালে নিজের কণ্ঠস্বর হারিয়ে না ফেলে। আমাদের আগামীর সংগ্রাম হবে মেধার সংগ্রাম। আমাদের আগামীর জয় হবে সার্বভৌমত্বের জয়।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক।



