তারাবির সূচনা হলো যেভাবে
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৫৫:২৯ অপরাহ্ন
মাওলানা ওলীউর রহমান :
তারাবিহ শব্দের অর্থ হলো বিশ্রাম করা। রমজানে ক্বিয়ামুল লাইল তথা তারাবিহ অনেক দীর্ঘ একটি সালাত। তাই প্রতি চার রাকআত পরে একটু বিশ্রামের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ কারণে এর নামকরণ করা হয়েছে তারাবিহ।
দ্বিতীয় হিজরিতে রোজা ফরজ হওয়ার পর রাসূল (সা.) রমজানে রাতের সালাত আদায় বা ক্বিয়ামুল লাইলের প্রতি উৎসাহ প্রদান করে বলেন- যে ব্যক্তি রমযান মাসে ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় কিয়ামুল লাইল (তারাবিহ) আদায় করবে, তার পূর্বের সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসায়ী)
ক্বিয়ামুল লাইল বা তারাবিহ সম্পর্কে হযরত আয়শা (রা.) বলেন- একবার রাসূল (সা.) গভীর রাতে বের হলেন এবং মসজিদে গিয়ে নামায (তারাবিহ) পড়লেন। লোকেরাও তাঁর সাথে নামায পড়লো। পরদিন লোকেরা এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা করার ফলে দ্বিতীয় রাতে এর চেয়ে বেশি লোক জমা হল। এর পরের দিনও এ বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা হল। ফলে তৃতীয় রাতে মসজিদে লোকসমাগম আরো বেশি হয়ে গেল। রাসূল (সা.) বের হয়ে নামায পড়লেন এবং লোকেরাও তার সাথে নামায পড়ল। চতুর্থ রাতে লোক সমাগম এতো বেশি হলো যে, মসজিদে জায়গা হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ল। এই দিন রাসূল সা. (রাতে বের না হয়ে) ফজরের সময় বের হলেন এবং ফজরের নামায শেষ করে লোকদের দিকে ফিরে শাহাদাতের বাণী উচ্চারণ করে বললেন, তোমাদের এখানে উপস্থিতির কারণ আমার কাছে অজানা নয়। কিন্তু আমার আশংকা হয় যে, তোমাদের উপর এই নামায ফরজ করে দেয়া হয়ে যায় কি না, আর ফরজ করে দেওয়া হলে তোমরা তা আদায় করতে অক্ষম হয়ে পড়বে। অতঃপর রাসূল (সা.) এর ইন্তেকাল হয়ে গেল। আর বিষয়টি এভাবেই রয়ে গেল। (বুখারী, মুসলিম, নাসায়ী)
রাসূল (সা.) এর ইন্তেকালের পরে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর খেলাফতের সময় এবং হযরত ওমর (রা.) এর খেলাফতের প্রথম দিকের কিছু সময় তারাবির নামাজ বিক্ষিপ্ত অবস্থায় চলতে থাকে। অতঃপর হযরত ওমর (রা.) জামাতবদ্ধভাবে তারাবির নামাজ নিয়মতান্ত্রিকভাবে চালু করেন।
হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আবদ আল কারী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রমযানের এক রাতে ওমর (রা.) এর সাথে মসজিদের দিকে বের হলাম। দেখলাম, বিভিন্ন অবস্থায় লোকেরা নামায পড়ছে, কেউ একা পড়ছে, আবার কোথাও জামাতব্ধ অবস্থায় লোকেরা নামায আদায় করছে। তখন ওমর (রা.) বললেন : আমার মন চায় এদের সবাইকে একজন কারীর সাথে জামাতভূক্ত করে দিলে তা খুব ভাল হবে। অতঃপর তিনি তাদেরকে হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) এর পিছনে জামাতভূক্ত করে দিলেন। এরপর আমি দ্বিতীয় রাতে আবার তার সাথে নামাযে বের হলাম। দেখলাম, লোকেরা তাদের ইমামের পেছনে নামায আদায় করছে। ওমর (রা.) বললেন : এটি একটি সুন্দর রেওয়াজ। (বুখারী, তিরমিযী, আবুদাউদ, ইবনে মাজাহ, নাসাঈ)
রাসূল (সা.) এর প্রবল ইচ্ছা অনুসারে হযরত ওমর (রা.) নিয়মতান্ত্রিকভাবে জামাতবদ্ধ তারাবিহ চালু করার পর থেকে আজ অবদি মুসলিম জাহানে তা অব্যাহত রয়েছে। এটা ইসালামের এক অনন্য সৌন্দর্য।
তারাবির নামায সুন্নতে মোয়াক্কাদা : তারাুবর নামায নারী-পুরুষ সকলের জন্য সুন্নতে মুআক্কাদা। কেননা, রাসূলে করীম সা. তারাবিহ সম্পর্কে বলেছেন- আল্লাহ তাআলা এই মাসের রোযা তোমাদের উপর ফরয করেছেন এবং রাত জেগে নামায আদায় করাকে অমি সুন্নত করেছি। (নাসাঈ ২২১০)
তাছাড়া খোলাফায়ে রাশেদীনদের কাজকে অনুসরণ করার জন্য রাসূল (সা.) তাগিদ করেছেন। তিনি বলেন- তোমরা আমার পরে আমার সূন্নাতকে আঁকড়ে ধরবে এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের সূন্নাতকেও আঁকড়ে ধরবে এবং এর উপর তোমরা দাঁত কামড়ে অটুট থাকবে। (আবু দাউদ ৪৬০৭, তিরমিজী ২৬৭৬)
ইমাম তাহতাবী লিখেছেন, তারাবী নামায সুন্নত, এই নামায ছেড়ে দেওয়া জায়েয নাই। (কামুসুল ফিকহ ২/৪৪৮)
তারাবির নামায কত রাকাত : প্রধান চার ইমাম ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সহ সংখ্যাগরিষ্ঠ উম্মতের ঐকবদ্ধ সিদ্ধান্ত হল- তারাবির নামাজ বিশ রাকাত। ইমাম মালিক রহ. ইয়াযীদ ইবনে রুমান থেকে বর্ণনা করেন- লোকেরা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এর খেলাফতকালে (বিতিরসহ) তেইশ রাকাত তারাবিহ পড়তেন। (মুয়াত্তা ইমাম মালিক-১/১১৫)
ইমাম বায়হাকী (রহ.) আল মা’রিফাহ কিতাবে বিশুদ্ধ সনদে হযরত সাঈব ইবনে ইয়াযীদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন : আমরা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর খেলাফতকালে বিশ রাকাত তারাবীহের নামায ও বিতর আদায় করতাম। (সুনানে কুবরা-২/৪৯৬)
রাসূল (সা.) এর প্রবল আগ্রহ ও ইচ্ছা থেকে যখন হযরত উমর (রা.) তারাবির নামাজ বিশ রাকাআত নির্ধারণ করেন এবং পরবর্তীতে হযরত উসমান ও আলী (রা.) এর উপর আমল করেন তখন সাহাবায়ে কেরামের এক বিরাট জামাত জীবিত ছিলেন এবং সাহাবী ও তাবেয়ীগণও এর উপর আমল করেছেন, কেউ কখনো আপত্তি করেন নাই। তাই বিশ রাকাতের উপর সাহাবা ও তাবেয়ীনগণের ইজমা বা ঐক্যমত হয়ে যায়।
ইমাম মালিক (রহ.) বলেন, রাসূল (সা.) অথবা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- মুসলমানগণ যে বিষয়টিকে উত্তম মনে করেন, তা আল্লাহর কাছেও উত্তম হিসেবে বিবেচিত হয় আর মুসলমানগণ যে বিষয়কে মন্দ মনে করেন, তা আল্লাহর কাছেও মন্দ বিবেচিত হয়। (মুস্তাদরাকে হাকীম-৩/৮৩)
কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, মদীনায় কোনো এক সময় ৩৬ রাকাত তারাবী আদায় করা হতো। এটা ছিলো কেবল সওয়াব বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। কারণ তখনকার সময়ে মক্কায় প্রতি চার রাকাত তারাবীর পরে একবার কাবা ঘরের তাওয়াফ করা হতো। অর্থাৎ, বিশ রাকাত তারাবি আদায়ের পাশাপাশি তারা চারবার পবিত্র কাবা ঘরের তাওয়াফও সম্পন্ন করতেন। মদীনায় যখণ এই সংবাদ পৌঁছলো তখন মদীনার মুসলমানগণ প্রতিবার তাওয়াফের পরিবর্তে অতিরিক্ত চার রাকাত নামাজ আদায় করতেন। এভাবে তারা অতিরিক্ত ১৬ রাকাত তারাবীসহ ৩৬ রাকাত আদায় করতেন।
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া ও তার অনুসারীগণের মতে তারাবীর নামাজ ৮ রাকাআত। তবে আল্লামা ইবনে তাইমিয়া এই মতও পোষণ করতেন যে, তারাবী কম পড়ার চেয়ে বেশি পড়া উত্তম। তিনি তার মতের স্বপক্ষে বুখারী শরীফে বর্ণিত হযরত আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীস পেশ করেন। তিনি বলেন, নবী সা. রমযান ও রমযান ছাড়া অন্য সময়ে এগারো রাকাতের বেশি রাতের নামাজ পড়তেন না। ৮ রাকাত তারাবীহ আর ৩ রাকাত বিতর। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, রাসূল সা. তারাবী ৮ রাকাত পড়তেন। এই হাদীসটি মূলত তাহাজ্জুদের নামাজের ব্যাপারে, তারাবীর ব্যাপারে নয়। কারণ হাদীসে রমযান ও রমযান ছাড়া বলা হয়েছে, আর রমযান ও রমযান ছাড়া কেবল তাহাজ্জুদের নামাযই পড়া যায়, তারাবী পড়া যায় না। সুতরাং এ হাদীস দিয়ে ৮ রাকাআত তারাবির পক্ষে দলীল দেওয়া যায় না।
কেউ কেউ মনে করেন তারাবী ও তাহাজ্জুদ একই নামাজ। অথচ তারাবী এবং তাহাজ্জুদ একই নামাজ নয়। রাতের প্রথম দিকে তারাবী পড়া হয় এবং শেষ দিকে পড়া হয় তাহাজ্জুদ। নবী করীম সা. ও উমর রা. এর সময়ে তারাবী রাতের প্রথম দিকে এবং তাহাজ্জুদ রাতের শেষ দিকে আদায় করা হতো। অবশ্য কোন সময় রাসূল সা. রাতের প্রথম দিকে নামাজ শুরু করছেন এবং শেষ দিকে শেষ করছেন।
সুতরাং তারাবীর নামাজ বিশ রাকাত পড়াই আবশ্যক। রমজান মাসে যত বেশি নামাজে সময় অতিবাহিত করা যাবে ততইতো ভালো। কোনো ভাবেই আট রাকাতের জন্য ক্যাম্পেইন করা এবং তারাবীর প্রতি সাধারণ মানুষকে নিরুৎসাহিত করা করা সমিচিন নয়।
লেখক : ইমাম ও খতীব, পূর্বভাটপাড়া জামে মসজিদ, ইসলামপুর মেজরটিলা, সিলেট।



