‘সিডস অফ সাদাকাহ’র অনন্য উদ্যোগ
৬৩ এতিম কন্যার রাজকীয় বিয়ে
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪৩:৫৫ অপরাহ্ন
ফায়যুর রাহমান :
সুমাইয়ার বয়স যখন তিন বছর, তখন তার হতদরিদ্র পিতা মারা যান| মায়ের অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়| পিতৃমাতৃহীন সুমাইয়া নিদারুণ কষ্টে দাদির কাছে বড় হয়| এখন সে ঊনিশ বছরের তরুণী| সে বিশ্বাসই করতে পারছে না সিলেটের আমান উল্লাহ কনভেনশন সেন্টারে এত রাজকীয় আয়োজনে তার বিয়ে হবে! কানে সোনার দোল থাকবে, গলায় গহনা থাকবে, লাগেজভরা গিফট থাকবে, আসবাবপত্র উপহার থাকবে, শহরের গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ তার বিয়েতে উপস্থিত থাকবে!
শুধু সুমাইয়া নয়, তার মতো ৬৩ এতিম কন্যার বিয়ের দায়িত্ব পালন করে মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করল যুক্তরাজ্য ভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘সিডস অফ সাদাকাহ’| রংপুর, গাইবান্ধা ও সিলেট অঞ্চল থেকে বাছাইকৃত ৬৩ এতিম কন্যার যৌতুকহীন গণবিয়ের আয়োজন করে সংস্থাটি|

গতকাল বৃহস্পতিবার নগরীর আমান উল্লাহ কনভেনশন সেন্টারে ব্যতিক্রমী এ গণবিয়ের অনুষ্ঠান ঘিরে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ| দেশবিদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে আয়োজনটি পরিণত হয় এক অনন্য মিলনমেলায়|
অনুষ্ঠানে বর-কনে, অভিভাবক ও অতিথিদের উপস্থিতিতে আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়| কারো চোখে আনন্দাশ্রু, কারো চোখে নীরব কৃতজ্ঞতা| সব মিলিয়ে আয়োজনটি হয়ে ওঠে মানবিকতার এক অনন্য উৎসব| এ আয়োজনের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের সামাজিক নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ পারিবারিক জীবনের সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানান আয়োজকরা|

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কনের কথা হয় এই প্রতিবেদকের সাথে| সে জানায়, যেদিন তার জন্ম হয়, সেদিনই তার মা মারা যান| তাকে দুগ্ধ পান করানোর মতো বাড়িতে কেউ ছিল না| এক নিঃসন্তান মহিলা তাকে দত্তক নিয়ে লালন-পালন করেন| তার বয়স যখন দুই বছর, তখন তার পিতাও মারা যান| দত্তক মায়ের কাছে বড় হওয়া মেয়েটি কল্পনাও করেনি একদিন এত বড় আয়োজনে তার বিয়ে হবে|
অনুষ্ঠানে গিয়ে জানা গেল এমন আরও অনেক বেদনা ও হাহাকারের গল্প| সামিয়া আক্তার (১৮) যখন তিনদিনের শিশু, তার পিতা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান| দরিদ্র মায়ের কাছে যখন সে বড় হচ্ছিল, একদিন অসুস্থ হয়ে তার মাও মারা যান| পুরোপুরি এতিম হয়ে প্রতিপালিত হয় খালার কাছে| আজ তারও বিয়ে|
সাবিনা আক্তার (১৮) ছিল খুবই হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান| তিন বছর বয়সে তার পিতা মারা যান| এক বছর পর সে মাকেও হারায়| জীবনের সাথে সংগ্রাম করতে করতে সে বড় হয় দাদির কাছে| আজ তারও বিয়ে|
আফসানা খাতুন (২১) যখন খুব ছোট, হঠাৎ স্ট্রোক করে তার হতদরিদ্র পিতা মারা যান| পিতার মৃত্যুর এক সপ্তাহ পরেই মারা যান স্নেহময়ী জননীও| অসহায় এতিম আফসানা বড় হয় তার দরিদ্র মামার সংসারে| আজ তারও বিয়ে হচ্ছে রাজকীয় আয়োজনে|
‘সিডস অব সাদাকাহ’র হেড অব অর্গানাইজেশন মো. জেইনুল আবেদিন জানান, বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রতিটি নবদম্পতির পরিবারের দশজন সদস্যকে যাতায়াত খরচ দিয়ে সিলেটে আনা হয়েছে| তিনি জানান, শুধু বিয়ে নয়, হানিমুন প্যাকেজও আছে এই আয়োজনের সাথে| নবদম্পতিকে তিনদিন সিলেটে রাখা হবে| ঘোরানো হবে পর্যটন স্পট| যাতে সারাজীবন এই স্মৃতি মনে থাকে|
তিনি আরও জানান, গত বুধবার সিলেটের অভিজাত হোটেলে এই দম্পতিগুলোর মেহেদিসন্ধ্যা হয়েছে| নগরীর হিলটাউন হোটেল ও গ্র্যান্ড মোস্তফায় ছিল তাদের মেহেদিসন্ধ্যা| আজ শুক্রবার তাদেরকে সাদাপাথর ঘুরতে নেওয়া হবে|
তিনি বলেন, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং তাদের স্বনির্ভর করে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য| এই গণবিবাহ সেই প্রচেষ্টারই একটি সফল উদাহরণ|
দাতব্য সংস্থা ওয়ামির কান্ট্রি ডাইরেক্টর ডা. রেদওয়ানুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিগর্গের মধ্যে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী, রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক হাবিবুর রহমান বেলাল ও সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি মুকতাবিস উন নূর, ‘সিডস অফ সাদাকাহ’র আবুল খায়ের ও জয়নুল আবেদীন রুহেলসহ কয়েকজন সাবেক সচিব ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন|
বক্তারা বলেন, যৌতুকবিহীন বিয়ে যে বাস্তবেও সম্ভব| এই আয়োজন তারই জীবন্ত উদাহরণ| ইসলামে বিয়েকে সহজ করার যে নির্দেশনা রয়েছে, এ উদ্যোগ সেই শিক্ষারই প্রতিফলন| তারা নবদম্পতিদের জন্য সুখী, স্থিতিশীল ও আদর্শ পরিবার গঠনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন|
বিয়ের খুতবা পাঠ করেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ শাহ ওয়ালীউল্লাহ| তিনি একে একে ৬৩ দম্পতির বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন| পরে নবদম্পতিদের সুখ-শান্তি ও কল্যাণ কামনায় বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন পাঠানটুলা শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা লুৎফুর রহমান|

নবদম্পতিদের জন্য উপহার হিসেবে দেওয়া হয় প্রায় দুই লাখ টাকা মূল্যের প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রী| পোশাকের পাশাপাশি খাট, বালিশ, তোষক ও ˆতজসপত্রসহ সংসার শুরু করার প্রয়োজনীয় উপকরণ| আয়োজকদের মতে, এই সহায়তা নবদম্পতির নতুন জীবনের শুরুটিকে কিছুটা হলেও সহজ ও নিরাপদ করবে|
অনুষ্ঠানের আয়োজকদের একজন ছিলেন ডা. ওরাকাতুল জান্নাত| তিনি সিলেটের ডাককে বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ শুধু একটি বিয়ের আয়োজন নয়, বরং নতুন জীবনের প্রতি আত্মবিশ্বাস ও আশার আলো জাগিয়ে তোলে| সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে ভবিষ্যতেও এমন মানবিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ|




