তেলিবাজারে ট্রাক-পিকআপ মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ৯
মর্গে বাবা, হাসপাতালে মা, অচেনা ভবিষ্যতে সন্তানেরা
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৪ মে ২০২৬, ২:০৪:৪১ অপরাহ্ন
লবীব আহমদ/জাহাঙ্গীর আলম মুসিক :
সিলেটের জালালাবাদ থানার রায়েরগাঁও এলাকার বাসিন্দা সুজাত আলীর ছেলে ও ৪ সন্তানের জনক বদরুল আমিন (৩৪)। এক সময় ভাড়ায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালালেও বেশ কয়েকদিন থেকে একটু ভালো জীবনযাপনের আশায় কাজ নেন নির্মাণ শ্রমিকের। একা কাজ করে ৪ সন্তানসহ সংসারের ব্যয়ভার পোষানো সম্ভব হতো না। যার কারণে মাঝেমধ্যে স্ত্রীকেও সাথে নিয়ে কাজে যেতেন। গতকাল রোববার সকালেও তারা ওসমানীনগরের দয়ামীরে একটি বিল্ডিংয়ের ছাদ ঢালাই কাজে অন্যান্য শ্রমিকের সাথে যাচ্ছিলেন তারা স্বামী-স্ত্রীও। সিলেট শহর থেকে যাওয়ার পথে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার তেলিবাজার এলাকায় যাওয়ার পথে খাগড়াছড়ি থেকে কাঁঠালবোঝাই একটি ট্রাকের সাথে তাদেরকে বহন করা ডিআই পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে ঘটনাস্থলেই মারা যান বদরুল। আর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তার স্ত্রী হাফিজা বেগম (৩০)।
কিছু না জেনেই আত্মীয়দের সাথে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছেন বদরুলের ৪ সন্তান তামিম (১১), জুবায়ের (১০), তানিয়া (৯) ও তাকরিম (৬)। এসে মাকে দেখেন হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন। কিন্তু, বাবাকে তারা দেখতে পারছেন না। কেননা তাদের বাবা আর বেঁচে নেই। তাদের নিয়ে আত্মীয়রা হাসপাতালের মর্গের সামনে দাঁড়ালেও তারা বুঝতে পারছে না তাদের বাবা যে এখানে লাশ হয়ে পড়ে আছেন। হাসপাতালের বেডে শুয়ে একদিকে মা ৪ সন্তানের দিকে চোখ বুলাচ্ছেন আর অন্যদিকে নিরবে অশ্রু ফেলছেন স্বামীকে হারিয়ে। অবুঝ চার সন্তান এখনো জানে না এই হাসপাতালের দুই ভিন্ন কক্ষে তাদের জীবনের গল্প দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একদিকে মায়ের বেঁচে থাকার লড়াই, অন্যদিকে বাবার চিরবিদায়।
শনিবারও যেখানে তামিমরা বাবা-মাকে এক সাথে দেখেছে, তাদের সাথে একসাথে থেকেছে, সেখানে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আর দেখতে পাচ্ছে না তাদের বাবাকে। মাকে দেখলেও মা কোনো কথা বলতে পারছেন না। এমনই এক হতবিহ্বল ঘটনা দেখা যায়- সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
বদরুলের দুলাভাই আকবর আলী বলেন, বদরুল ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল মানুষ। দিন-রাত খেটে সংসার চালাত। এমন একজন মানুষকে এভাবে হারাতে হবে, আমরা কখনো ভাবিনি। দীর্ঘদিন ধরে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাতো সে। অভাব-অনটনের মধ্যেও কখনো হাল ছাড়েনি। হাফিজা এখনো ঠিকভাবে কথা বলতে পারছে না। স্বামীকে হারিয়ে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। চারটা ছোট বাচ্চা নিয়ে কী হবে এই চিন্তায় আমরা সবাই দিশেহারা।
গতকাল রোববার সকালে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার তেলিবাজার এলাকার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে কাঁঠালবোঝাই ট্রাক (চট্র মেট্রো-ট ১২-০৭৭৪) ও শ্রমিকবাহী ডিআই ট্রাকের (নম্বর সিলেট -ন ১১-১১১০) মুখোমুখি সংঘর্ষে ২ নারীসহ ৯ নির্মাণ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন আরও ৬ জন। তারা সকলেই সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
জানা যায়, নগরীর আম্বরখানা পয়েন্টে থেকে ১৫ জন ঢালাই শ্রমিক নিয়ে একটি পিকআপে করে ওসমানী নগরের দয়ামীরের দিকে যাচ্ছিলেন। তাদের সঙ্গে ছিল মিক্সার মেশিনও। পিকআপটি তেলিবাজার ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা কাঁঠালবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। তখন পিকআপে থাকা সবাই ছিটকে পড়েন। ঘটনাস্থলে মারা যায় চারজন। সিলেট এমএজি ওসমানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও চারজনের মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় নিহত বাকি ৭ জন হলেন- সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার মৃত ইদ্রিসের মেয়ে নার্গিস (৪৩), বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মুক্তিরখলার আব্দুল গফফারের দুই ছেলে আজির উদ্দিন (২৫) ও আমির উদ্দিন (২২), দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামের মৃত করম আলীর ছেলে মো. নুরুজ আলী (৫৫), একই উপজেলার সেচনি গ্রামের বশির মিয়ার মেয়ে মনি বেগম (২৯) এবং নূর নগরের মৃত নূর ইসলামের ছেলে মো. ফরিদুল (৩৫), কোম্পানীগঞ্জের শিবপুর গ্রামের কুটির বিশ্বাসের ছেলে পান্ডব বিশ্বাস (২০)। এছাড়া, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে তিনি মারা যান রামিম মিয়া (৫০)। তিনি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়ার আলিমুদ্দিনের ছেলে।
নিহত আপন দুই-ভাই
নিহত ৮ জনের মধ্যে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মুক্তিরখলা গ্রামের দুই ভাই আজির উদ্দিন (২৫) ও আমির উদ্দিন (২২) রয়েছেন। প্রায় ১০ বছর ধরে সিলেট নগরীর সুবিদবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করতেন তারা। বেলা একটার দিকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে গিয়ে নিহত দুই ভাইয়ের লাশ শনাক্ত করেন তাঁদের খালাতো ভাই শামীম আহমদ। তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে দুর্ঘটনার খবর ও নিহত ব্যক্তিদের ছবি দেখে সন্দেহ হলে তিনি হাসপাতালে আসেন। পরে মরদেহ দেখে দুই ভাইকে শনাক্ত করেন। একসঙ্গে দুই ভাইকে হারিয়ে পরিবারে মাতম চলছে। তারা খুব হতদরিদ্র। সিলেটে দিনমজুরের কাজ করতেন এই দুই ভাই। আজ তারা দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছেন। এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেয়ার মতো না। কয়েক বছর আগে তাদের ছোট ভাই কুকুরের কামড়ে মারা যায়। তাঁর মা প্রায় ৩ মাস দুর্ঘটনায় কোমর ভাঙ্গার কারণে ওসমানী মেডিকেলে ভর্তি ছিলেন। তাদের বোন প্রতিবন্ধী। নিহত একজনের ছোট ছোট তিনটি বাচ্চা রয়েছে। এই পরিবারটি একেবারে পথে বসে গেছে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল মতিন খান বলেন, ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। পরিবারটি খুবই অসহায়। এমন দুর্ঘটনা কখনোই কাম্য নয়। এখনো মরদেহ পৌঁছায়নি। আমি সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যা যা করণীয় তা করা হবে।
অভিমানে বাড়ি ছেড়ে লাশ হলেন পাণ্ডব
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শিবপুর গ্রামের পাণ্ডব বিশ্বাস কাজ করা নিয়ে অভিমান করে বাড়ি থেকে সিলেট শহরে এসেছিলেন দুই সপ্তাহ আগে। তিনি নির্মাণ কাজে ঢালাই শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সিলেটে থাকতেন নগরীর লোহারপাড়া এলাকায় পিসির বাসায়; সেখান থেকে রোববার সকালে বের হয়েছিলেন কাজে যাওয়ার জন্য। দুর্ঘটনায় নিহত ওই আটজনের সাথে সেও প্রাণ হারায় সড়ক দুর্ঘটনায়।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে কাকা পুলিন বিশ্বাস নিহত পাণ্ডব বিশ্বাসের মরদেহ বাড়ি নিয়ে যেতে ওসমানী হাসপাতালে আসেন। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বাড়িতে কাজকাম নিয়ে কথাবার্তা বলায় রাগ করে শহরে এসেছিল সে। কারণ এখন বৈশাখি কাজ চলছে, পাণ্ডব এই কাজ করতে পারত না। সে বালুর কাজ করত, তাকে অন্য কোনো কাজ করার কথা বললে রাগ করত। তাই সে সিলেটে এসে ঢালাই শ্রমিক হিসবে কাজ করছিল তার পিসির বাসায় থেকে। পাণ্ডবের বাবা আগেই মারা গেছেন। পরিবারে মা, বড় ভাই ও বৌদি রয়েছে।
এদিকে সড়ক দুর্ঘটনার খবরে নিহতদের পরিবারে মাতম চলছে। পরিবারের সদস্যদের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু মেনে নিতে পারছেননা স্বজনরা।
দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করে রোববার সন্ধ্যায় সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মো. মঞ্জুরুল আলম জানান, তাদের লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফনের জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ হস্তান্তরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ট্রাকের হেল্পারকে আটক করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৩ সালের ৭ জুন সকালে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার নাজির বাজার এলাকার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ট্রাক-পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৫ জন নির্মাণ শ্রমিক নিহত হন। তারাও একই এলাকায় কাজে যাচ্ছিলেন।




