বিশ্বকাপের উন্মাদনা থেকে সবুজের বার্তা: মানিকগঞ্জের কৌড়ি গ্রামে ৫০০ গাছের চারা রোপণ
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৪ জুলাই ২০২৬, ৯:৫৫:৪৯ অপরাহ্ন
হরিরামপুর (মানিকগঞ্জ): বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে যখন দেশের নানা প্রান্তে চলছে প্রিয় দলের পতাকা ও উচ্ছ্বাসের প্রতিযোগিতা, তখন সেই আবেগকে পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে রূপ দিয়েছেন একদল তরুণ। তাদের উদ্যোগে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার সবুজে ঘেরা কৌড়ি গ্রামে রোপণ ও বিতরণ করা হয়েছে আরও ৫০০ দেশীয় ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা।
‘আর্জেন্টিনা ফ্যানস ফর নেচার’-এর উদ্যোগে এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কৌড়ি বহুমুখী উন্নয়ন সংস্থা-র সহযোগিতায় আয়োজিত এ কর্মসূচিতে গ্রামের বিভিন্ন পরিবারের হাতে চারা তুলে দেওয়া হয়। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্মারক বৃক্ষ রোপণ করা হয়।
বিশ্বকাপ উপলক্ষে পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তা ছড়িয়ে দিতে গত ৭ জুন দেশব্যাপী ৪ হাজার গাছের চারা রোপণ ও বিতরণের ঘোষণা দেয় ‘আর্জেন্টিনা ফ্যানস ফর নেচার’। সেই লক্ষ্য গত শনিবার কক্সবাজারে পূরণ হয়। কৌড়ি গ্রামের আজকের ৫০০ চারাসহ সংগঠনটির উদ্যোগে এ পর্যন্ত মোট ৪ হাজার ৭০০টি গাছের চারা রোপণ ও বিতরণ করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় এসব গাছের পরিচর্যার দায়িত্বও স্বেচ্ছাসেবীরা গ্রহণ করেছেন।
কৌড়ি শুধু একটি গ্রাম নয়, এটি বাংলাদেশের বৃক্ষপ্রেমীদের কাছে একটি অনুপ্রেরণার নাম। প্রয়াত বৃক্ষপ্রেমী শাহজাহান বিশ্বাস নিজের উদ্যোগে প্রায় ৬০ হাজার গাছ লাগিয়ে পুরো গ্রামকে সবুজের আবরণে ঢেকে দিয়েছিলেন। ২০২২ সালে তিনি মারা গেলেও তাঁর সৃষ্টি আজও জীবন্ত। গ্রামের রাস্তা, বাড়ির আঙিনা এবং খোলা জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গাছগুলো যেন তাঁর নীরব স্মৃতিচিহ্ন।
শাহজাহান বিশ্বাসের এই সবুজ বিপ্লবের নেপথ্যে ছিলেন ইউনিসেফের সাবেক কর্মকর্তা এ কে এম কামাল উদ্দিন, বীর মুক্তিযোদ্ধা সালাহউদ্দিন মুরাদ, অ্যাসেট ডেভেলপমেন্টের পরিচালক আশরাফুজ্জামান টিটু, আবু বকর সিদ্দিকসহ কয়েকজন পরিবেশপ্রেমী। তাঁদের উৎসাহ, পরিকল্পনা ও সহযোগিতায় কৌড়ি আজ একটি অনুকরণীয় সবুজ গ্রামে পরিণত হয়েছে।
চন্দ্রকলি ফাউন্ডেশন গত তিন বছর ধরে কৌড়ি গ্রামে পরিবেশ, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নমূলক নানা কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে। এসব উদ্যোগে স্থানীয় অংশীদার হিসেবে ধারাবাহিকভাবে সহযোগিতা করছে কৌড়ি বহুমুখী উন্নয়ন সংস্থা।
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সালাহউদ্দিন মুরাদ, কৌড়ি বহুমুখী উন্নয়ন সংস্থার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, সাংগঠনিক সম্পাদক সালাহ উদ্দিন রাজীব, চন্দ্রকলি ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও আর্জেন্টিনা ফ্যানস ফর নেচার-এর প্রতিষ্ঠাতা শাখাওয়াত উল্লাহ, চন্দ্রকলি ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট দেলোয়ার হোসেনসহ স্থানীয় পরিবেশপ্রেমী, স্বেচ্ছাসেবী ও ফুটবল সমর্থকেরা।
অনুষ্ঠানে বীর মুক্তিযোদ্ধা সালাহউদ্দিন মুরাদ বলেন, “জীবনে ফুটবলকে ঘিরে অনেক উন্মাদনা দেখেছি। কিন্তু সেই উচ্ছ্বাসকে গাছ লাগানোর মতো জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করতে আগে দেখিনি। খেলার আনন্দ যদি প্রকৃতিকে বাঁচানোর অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে, তাহলে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় বিজয়।”
আয়োজকরা বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, বন উজাড়, নদীভাঙন ও পরিবেশ দূষণের এই সময়ে প্রতিটি গাছ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বিনিয়োগ। তাই ফুটবলপ্রেমীদের আবেগকে পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ববোধে রূপান্তরিত করাই ‘আর্জেন্টিনা ফ্যানস ফর নেচার’-এর লক্ষ্য।
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা শাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, “বিশ্বকাপের আনন্দ কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়, কিন্তু একটি গাছ কয়েক দশক ধরে মানুষকে ছায়া, অক্সিজেন, ফল এবং নিরাপদ পরিবেশ উপহার দেয়। আমরা চাই, ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা যেন দেশের প্রতি, প্রকৃতির প্রতি এবং আগামী প্রজন্মের প্রতিও দায়িত্ববোধ তৈরি করে।”
আয়োজকদের আশা, এই উদ্যোগ শুধু কয়েক হাজার গাছ লাগানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দেশের তরুণদের মধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণে একটি নতুন সামাজিক আন্দোলনের সূচনা করবে।



