চারদফা সময়বৃদ্ধি
জগন্নাথপুরের আর্চ সেতুর কাজ কবে শেষ হবে?
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২০ নভেম্বর ২০২৫, ১২:২৩:৩৭ অপরাহ্ন
অমিত দেব, জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) থেকে : সিলেটের প্রবাসী অধ্যুষিত জগন্নাথপুর উপজেলা সদরে নলজুর নদীর ওপর আর্চসেতুর নির্মাণ কাজ চারদফা সময় বৃদ্ধির পরও শেষ হয়নি।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন রাজধানীর হাতিরঝিলের আদলে নির্মাণাধীন সিলেট বিভাগের প্রথম এই আর্চ সেতুর কাজ কবে শেষ হবে তাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ফলে উপজেলাবাসীর মধ্যে বিরাজ করছে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ।
এলাকাবাসী ও এলজিইডি সূত্র জানায়, জগন্নাথপুর উপজেলা সদরে নলজুর নদীর ওপর ১৯৮৬ সালে খাদ্যগুদামের সামনে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়নে নলজুর সেতু নির্মাণ করা হয়। ২০২২ সালে জগন্নাথপুর-সুনামগঞ্জ-আউশকান্দি আঞ্চলিক মহাসড়ক চালু হলে জগন্নাথপুর পৌর শহরে যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়। ফলে জনদুর্ভোগ লাঘবে সরু এ সেতু ভেঙে রাজধানীর হাতিরঝিলের আদলে সিলেট বিভাগের প্রথম দৃষ্টিনন্দন আর্চ সেতুর কাজ শুরু করে এলজিইডি। ২০২৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রায় ১৪ কোটি টাকা বরাদ্দে তৎকালীন সংসদ সদস্য, সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এ সেতুর নির্মাণকাজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সেতুটির কাজ সম্পন্নের সময়সীমা বেধে দেয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় ডিসেম্বর পর্যন্ত আবারও সময় বাড়ানো হয়। তারপরও ধীরগতিতে কাজ চলার কারণে নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। তবুও ভাটিবাংলা এন্টার প্রাইজ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি কাজ শেষ করতে পারেনি। সর্বশেষ অক্টোবর পর্যন্ত আরেক দফা সময় বাড়ানো হলেও শেষ করা যায়নি সেতুটির নির্মাণ কাজ।
এদিকে, এ সেতুর পাশে যানবাহন চলাচলের জন্য বিকল্প হিসেবে জোড়াতালির একটি বেইলি সেতু ও পায়ে হেঁটে চলাচলের জন্য বাঁশের সাঁকো তৈরি করা হয়। দুটোই এখন চলাচলের অনুপযোগী। জোড়াতালির বিকল্প সেতুর অ্যাপ্রোচের ইট সরে গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় যানবাহন চলাচল দুরূহ হয়ে উঠছে। পায়ে হেঁটে চলাচলের ক্ষেত্রেও বাঁশের সাঁকোর অবস্থা আরও নাজুক ।
এ প্রেক্ষাপটে উপজেলাবাসীর ভরসা ছিল নলজুর নদীর উপর বিকল্প ডাকবাংলো সেতু। কিন্তু এ সেতুর অবস্থাও নড়বড়ে। ১৯৮৮ সালে এলাকাবাসীর অর্থায়নে ডাকবাংলার সামনে নলজুর নদীর উপর এ সেতু নির্মাণ কাজ শুরু হয়। পরে ১৯৯৬ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদের নির্দেশে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে সেতুর কাজ শেষ করা হয়।
এদিকে, ২০২১ সালে নলজুর নদী খননকালে সেতুর পিলারের কাছ থেকে খননযন্ত্র দিয়ে মাটি উত্তোলন করায় ডাকবাংলা সেতুর দুটো অংশ দেবে যায়। এক বছর সেতু দিয়ে সবধরনের চলাচল বন্ধ থাকার পর স্টিলের পাটাতন বসিয়ে সেতুটি জোড়াতালি দিয়ে চালু করা হয়। এখন সেতু দিয়ে একটি অটোরিকশা চলাচল করলে একজন পথচারী পাঁয়ে হেঁটে চলাচল করতে পারে না। সেতু থেকে পড়ে গিয়ে আহত হচ্ছেন লোকজন। ইতিমধ্যে যানবাহনের চাপে সেতুর রেলিং ভেঙে যায়। বাঁশ দিয়ে রেলিং দেয়া হয়েছে। পাটাতন ফাঁক হয়ে যাওয়ায় প্রতিদিন এ সেতুতে ঘটছে দুর্ঘটনা। নারী, শিশুসহ অনেকেই দুর্ঘটনার শিকার হয়ে আহত হচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গুদামের সামনে আর্চ সেতুর ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। এখন শ্রমিকরা মিলে সেতুর দুই পাশের দৃষ্টিনন্দন আর্চের কাজ করছেন। তিন ফুট করে করে ঢালাই দেয়া হচ্ছে। সেতুর দুই পাশে কাজ দৃশ্যমান হলেও কাজ ধীরগতিতে চলছে বলে জনসাধারণের অভিযোগ।
অপরদিকে ঠিকাদারের লোকজনের দাবি, দৃষ্টিনন্দন আর্চ সেতুর আর্চের ঢালাই একসঙ্গে দেয়ার সুযোগ নেই। তাই তিনফুট অন্তর অন্তর করে ঢালাই দেয়া হচ্ছে। চলতি মাসেই ঢালাইয়ের কাজ শেষ করতে চেষ্টা করছেন।
সেতুর পাড়ে কথা হয় জগন্নাথপুর বাজারের ব্যবসায়ী মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন বেলাল এর সঙ্গে।
তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এ সেতুর কাজ বার বার সময় বাড়িয়ে নাগরিকদের চরম দুর্ভোগে রাখা হয়েছে। এভাবে ধীরগতিতে কাজ চললে কবে শেষ হবে তা বলা যাচ্ছে না। তাঁর অভিযোগ, বিকল্প সড়ক বেইলি সেতু ও বাঁশের সাঁকোর অবস্থা নাজুক হওয়ায় উপজেলাবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
ডাকবাংলা সড়কের ব্যবসায়ী কবির মিয়া জানান, প্রতিদিন ডাকবাংলা সড়কের সামনের সেতু দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে লোকজন ও যানবাহন চলাচল করছে। তীব্র যানজটের পাশাপাশি ঘটছে দুর্ঘটনা। একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তিনি প্রায় প্রতিদিন দুর্ঘটনা দেখছেন।
উপজেলা নাগরিক অধিকার পরিষদের আহ্বায়ক এম এ কাদির বলেন, নলজুর নদীর দুটি সেতু একসঙ্গে অচল হওয়ায় সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন উপজেলাবাসী। মেয়াদ শেষ হলেও আর্চ সেতুর কাজ শেষ না হওয়া দুঃখজনক। অপরদিকে ডাকবাংলা সেতুর কাজের দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হলেও এখনো ঠিকাদার কাজ শুরু করেনি। জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে দ্রুত সেতু দুটির কাজ বাস্তবায়ন করার জোর দাবি জানান তিনি।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী সোহরাব হোসেন দৈনিক সিলেটের ডাককে বলেন, নানা জটিলতায় আর্চসেতুর কাজ শেষ করতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।
তিনি বলেন, ঠিকাদার অক্টোবর মাসের পর আরেকদফা মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করলেও নতুন করে সময়বৃদ্ধি করা হয়নি। আমরা আশাবাদী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে সেতুর দুই অংশের আর্চের ঢালাইয়ের কাজ শেষ হবে।
তিনি বলেন, সেতুর কাজ দ্রুত শেষ করতে সার্বক্ষণিক নজরদারি রয়েছে। অপরদিকে, জুন মাসে ডাকবাংলা সেতুর কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। মেসার্স হাসান এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ১৮০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৮ ফুট প্রস্তে সাড়ে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি বাস্তবায়ন করবে। শিগগিরই সেতুর কাজ শুরু করতে ঠিকাদারকে তাগিদ দেয়া হয়েছে।




