বরাক উপত্যকায় ইসলামি বিস্তারের প্রাণপুরুষ
সিলেটের সূর্যসন্তান শায়খুল হাদিস আব্দুল জলিল চৌধুরী বদরপুরী (রহ.)
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১৬ জুলাই ২০২৬, ৭:২৮:৪০ অপরাহ্ন
রুমী চৌধুরী :
উত্তরপূর্ব ভারত, বিশেষ করে আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মনিপুর, নাগাল্যান্ড, মিজোরামসহ, বরাক উপত্যকা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ইসলামি শিক্ষা এবং দ্বীনি প্রতিষ্ঠান গঠনের ইতিহাসে যে ক’জন মনীষির অবদান যুগ যুগ ধরে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে, তাঁদের অন্যতম শায়খুল হাদিস হযরত মাওলানা আব্দুল জলিল চৌধুরী (রহ.)। তিনি ছিলেন উত্তরপূর্ব ভারতের প্রথম আমীরে শরীয়ত, প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক, স্বাধীনতা সংগ্রামী, দক্ষ সংগঠক এবং আসাম বিধানসভার ছয়বারের নির্বাচিত সদস্য। বিশেষ করে সাবাহি মক্তব শিক্ষাকে একটি সুসংগঠিত, শ্রেণিভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে এনে তিনি উত্তরপূর্ব ভারতের ইসলামী প্রাথমিক শিক্ষায় এক স্থায়ী নবজাগরণের সূচনা করেন।
মাওলানা আব্দুল জলিল চৌধুরী ১৯২৫ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ-ভারতের সিলেট জেলার দক্ষিণ সুরমা উপজেলার তুরুকখলা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন আসগর চৌধুরী এবং মাতা শামসুন্নেসা চৌধুরী। পারিবারিক পরিবেশ ছিল ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ ও জ্ঞানচর্চায় সমৃদ্ধ। তাঁর মা ফারসি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন এবং শিশুকালেই পুত্রের প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি নিজ হাতে গড়ে তোলেন। এই পারিবারিক শিক্ষাই পরবর্তী জীবনে তাঁর জ্ঞানপিপাসা, চরিত্রগঠন এবং দ্বীনি নেতৃত্বের ভিত সুদৃঢ় করে।
প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি স্থানীয় দাউদপুর মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করেন। পরে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন এবং এমএম ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনেই তিনি মেধা, নেতৃত্ব এবং সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দেন। তিনি ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং একই সময়ে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। দেশপ্রেমিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা তাঁর আদর্শিক দৃঢ়তা ও নেতৃত্বের বিকাশকে আরও শাণিত করে।
তিনি উচ্চতর ইসলামি শিক্ষার উদ্দেশ্যে সাহারানপুরের বিশ্বখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন। সেখানে তিনি উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও আলিমদের সান্নিধ্যে হাদিস, তাফসির, ফিকহ এবং ইসলামি দর্শনের উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.), আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী (রহ.), আল্লামা ইজাজ আলী আমরুহী (রহ.), মুফতি মুহাম্মদ শফি উসমানী (রহ.) এবং শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মদ ইদ্রিস কান্ধলভি (রহ.)। তাঁদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও আদর্শ তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে এবং পরবর্তীকালে তাঁকে একজন প্রাজ্ঞ আলিম ও দূরদর্শী সমাজনেতায় পরিণত করে।
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে ফারসি ভাষার শিক্ষক হিসেবে। পরবর্তীতে যশোর আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এবং পরে গোলাপগঞ্জের ফুলবাড়ি আজিরিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সমাজে ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তার, নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং জনসচেতনতা গড়ে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করেন। তাঁর শিক্ষাদর্শন ছিল কেবল পাঠদান নয়; বরং এমন মানুষ গড়ে তোলা, যারা দ্বীন, দেশ ও সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হবে।
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং পরে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সক্রিয় নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। সাতচল্লিশের দেশভাগের সময় তিনি ভারত বিভাজনের বিরোধিতা করেন এবং অখণ্ড ভারতের পক্ষে অবস্থান নেন। দেশভাগ-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হলেও তিনি আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।
১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর শ্রদ্ধেয় উস্তাদ ও মুর্শিদ শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর নির্দেশ ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু এবং আসামের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী গোপীনাথ বরদলৈয়ের আন্তরিক আমন্ত্রণ এবং উত্তরপূর্ব ভারতের মুসলিম সমাজে একজন যোগ্য ধর্মীয় নেতার প্রয়োজনের প্রেক্ষাপটে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বৃহত্তর সিলেট থেকে আসামের করিমগঞ্জ জেলার আলাকুলিপুরে হিযরত করেন। অল্প কিছুদিন পর তিনি বদরপুর অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং সেখান থেকেই উত্তরপূর্ব ভারতে দ্বীনি শিক্ষা, শরিয়াভিত্তিক নেতৃত্ব ও সামাজিক সংস্কারের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন।
এই হিযরত ছিল না ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বা জীবিকার সন্ধানে কোনো স্থানান্তর; বরং ছিল একটি সুদূরপ্রসারী দাওয়াতি, শিক্ষামূলক ও সমাজ সংস্কারমূলক মিশনের সূচনা। পরবর্তী চার দশক ধরে তিনি উত্তরপূর্ব ভারতের মুসলিম সমাজে যে শিক্ষা-সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন এবং ধর্মীয় নেতৃত্বের ভিত্তি নির্মাণ করেন, তা আজও ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
আসামে হিযরতের পর হযরত মাওলানা আব্দুল জলিল চৌধুরী (রহ.)-এর সামনে যে বৃহত্তম চ্যালেঞ্জটি উপস্থিত হয়েছিল, তা ছিল উত্তরপূর্ব ভারতের মুসলিম সমাজের ধর্মীয় ও শিক্ষাগত পুনর্গঠন। দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চলের বহু মুসলিম পরিবার অনিশ্চয়তা, নেতৃত্বের সংকট এবং শিক্ষার পশ্চাৎপদতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল। বিশেষ করে শিশুদের প্রাথমিক দ্বীনি শিক্ষার ক্ষেত্রে ছিল পরিকল্পনার অভাব, প্রশিক্ষিত শিক্ষকসংকট এবং কোনো অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার অনুপস্থিতি। এই বাস্তবতা গভীরভাবে উপলব্ধি করে তিনি আজীবন ইসলামী শিক্ষা সংস্কারকে তাঁর অন্যতম প্রধান কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করেন।
আসামে আগমনের কিছুদিন পরই দেওরাইল সিনিয়র মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা হযরত শাহ ইয়াকুব বদরপুরী (রহ.) ও শায়খুল হাদীস আল্লামা মুশাহিদ আহমদ বায়মপুরী (রহ.) এর আহ্বানে তিনি মাদরাসাটির অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর বিচক্ষণ নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটির পাঠ্যক্রম, শিক্ষার মান, প্রশাসনিক কাঠামো এবং পাঠদানের পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। দেওবন্দি শিক্ষা-দর্শনের আলোকে তিনি মাদরাসাটিকে পুনর্গঠন করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই এটি উত্তর–পূর্ব ভারতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ১৯৪৮ সালে আসাম সরকার প্রতিষ্ঠানটিকে সরকারি স্বীকৃতি প্রদান করে, যা তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ও শিক্ষাগত দূরদর্শিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরবর্তীকালে শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর হাতে ১৯৫৭ সালে দেওরাইল সিনিয়র মাদরাসায় হাদিস বিভাগের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। দেওরাইল সিনিয়র মাদরাসা পরবর্তীতে আল জামিয়াতুল আরবিয়াতুল ইসলামিয়া নামকরণ করা হয়। সেই বিভাগে শায়খুল হাদিস হিসেবে মাওলানা আব্দুল জলিল চৌধুরী (রহ.) দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দরসে হাদিস থেকে অসংখ্য আলিম, খতিব, মুফতি, শিক্ষক ও সমাজনেতা গড়ে ওঠেন, যারা পরবর্তীকালে উত্তর–পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্বীনি শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
শিক্ষা ও সমাজসংস্কারের পাশাপাশি তিনি জনজীবনেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫২ সালে স্বাধীন ভারতের প্রথম আসাম বিধানসভা নির্বাচনে বদরপুর কেন্দ্র থেকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। এরপর তিনি ধারাবাহিকভাবে ছয়বার বিধায়ক নির্বাচিত হয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেন। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের মূল ভিত্তি ছিল জনকল্যাণ, শিক্ষার প্রসার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সংখ্যালঘু মুসলিম সমাজের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা। বিধানসভায় তিনি শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন ও ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন।
এই সময়ে স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, লাল বাহাদুর শাস্ত্রী, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জাকির হোসেন ও ফখর উদ্দিন আলী আহমদ, ইন্দিরা গান্ধী, শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.), মাওলানা হিফজুর রহমান (রহ.) সহ জাতীয় ও ধর্মীয় অঙ্গনের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যক্তিগত মর্যাদা কখনোই তাঁকে তাঁর মূল লক্ষ্যÑ দ্বীনি শিক্ষা ও সমাজসংস্কারÑ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
অখণ্ড আসাম জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করার সময় তিনি উত্তর–পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সফর করে সাবাহি মক্তব শিক্ষার বাস্তব অবস্থা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি লক্ষ করেন, অধিকাংশ মক্তবে নির্ধারিত পাঠ্যক্রম নেই, শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষা নেই, পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই, প্রশিক্ষিত মোয়াল্লেমের অভাব রয়েছে এবং শিক্ষার মান অঞ্চলভেদে ব্যাপকভাবে ভিন্ন। ফলে একটি শিশুর দ্বীনি শিক্ষার মান অনেকাংশে নির্ভর করত সংশ্লিষ্ট মক্তব বা শিক্ষক ব্যক্তিগতভাবে কতটা দক্ষ, তার ওপর।
এই বাস্তবতা তাঁকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। তিনি উপলব্ধি করেন, পরিকল্পিত সংস্কার ছাড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুশৃঙ্খল ইসলামি শিক্ষা প্রদান সম্ভব নয়। তাই তিনি একটি অভিন্ন পাঠ্যক্রম, শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষা, প্রশিক্ষিত মোয়াল্লেম, নিয়মিত পরিদর্শন এবং কেন্দ্রীয় পরীক্ষাব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেন। কিন্তু তাঁর এই দূরদর্শী পরিকল্পনা সে সময় সর্বত্র সমর্থন পায়নি। সংগঠনের অভ্যন্তরে মতপার্থক্য দেখা দেয় এবং কিছু মহল তাঁর সংস্কার প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে। তবুও তিনি অভীষ্ট লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি। কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিলÑ প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামি শিক্ষা ছাড়া সমাজের টেকসই ধর্মীয় পুনর্জাগরণ সম্ভব নয়।
এই আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই ১৯৬৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘এদারায়ে তালিম ও তানজিম’ নামে একটি সামাজিক ও সংস্কারমূলক সংস্থা। উত্তরপূর্ব ভারতের ইসলামি শিক্ষার ইতিহাসে এটি ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সাবাহি মক্তব শিক্ষাকে পরিকল্পিত, সুশৃঙ্খল এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়। প্রচলিত মক্তব শিক্ষাকে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার উপযোগী কাঠামোর মধ্যে এনে তিনি এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেন।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, হাইলাকান্দি জেলার বাইয়ারপার সাবাহি মক্তবে মাত্র ছয়জন ছাত্র ও একজন ছাত্রীকে নিয়ে এই নবযাত্রার সূচনা হয়। ক্ষুদ্র এই উদ্যোগই পরবর্তীকালে উত্তরপূর্ব ভারতের হাজার হাজার মক্তব এবং লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর জন্য একটি সুসংগঠিত শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি রচনা করে।
১৯৬৫ সালে ‘এদারায় তালিম ও তানজিম’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘আসাম নদওয়াতুত তামীর’ রাখা হয়। পরবর্তীকালে উত্তরপূর্ব ভারত এমারতে শরীয়ত এবং নদওয়াতুত তামীরের যৌথ তত্ত্বাবধানে সাবাহি মক্তব শিক্ষা আন্দোলন ক্রমাগত সম্প্রসারিত হতে থাকে। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি কেবল একটি সংগঠনই গড়ে তোলেননি, বরং ইসলামী প্রাথমিক শিক্ষাকে একটি সুদৃঢ়, স্থায়ী ও যুগোপযোগী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করার পথও নির্মাণ করেন।
এদারায় তালিম ও তানজিম প্রতিষ্ঠার পর হযরত মাওলানা আব্দুল জলিল চৌধুরী (রহ.) এর প্রধান লক্ষ্য ছিল সাবাহি মক্তব শিক্ষাকে একটি সুসংগঠিত ও অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থায় রূপান্তর করা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, একটি সুনির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম, নির্ধারিত শ্রেণিবিন্যাস এবং নিয়মিত মূল্যায়ন ব্যবস্থা ছাড়া প্রাথমিক দ্বীনি শিক্ষার কাক্সিক্ষত মান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি সাবাহি মক্তব শিক্ষার জন্য একটি পরিকল্পিত শিক্ষাকাঠামো প্রবর্তন করেন, যা উত্তরপূর্ব ভারতের ইসলামি শিক্ষা ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
তাঁর প্রবর্তিত ব্যবস্থায় সাবাহি মক্তব শিক্ষাকে পাঁচটি শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা হয়Ñ আউয়াল, দুওম, ছুওম, চাহারম ও পাঞ্জম। প্রতিটি শ্রেণির জন্য পৃথক শিক্ষালক্ষ্য, নির্ধারিত পাঠ্যসূচি এবং ধাপে ধাপে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়। শিশুদের বয়স, মানসিক বিকাশ এবং দ্বীনি জ্ঞানের স্তর বিবেচনায় রেখে পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করা হয়, যাতে তারা ধীরে ধীরে কুরআন তিলাওয়াত, আকিদা, ইবাদত, আখলাক এবং ইসলামের মৌলিক শিক্ষা সুসংহতভাবে আয়ত্ত করতে পারে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য ‘প্রাইমারি দ্বীনি শিক্ষা’ প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডসহ একাধিক পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হয়। পাশাপাশি প্রতিটি মক্তবে ভর্তি নিবন্ধন, উপস্থিতি রেজিস্টার, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি সংরক্ষণ, নিয়মিত পাঠদান এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর পরিদর্শনের ব্যবস্থা চালু করা হয়। জেলা পর্যায়ে অবৈতনিক পর্যবেক্ষক নিয়োগ, শ্রেণিকক্ষে ব্ল্যাকবোর্ডের ব্যবহার, খাতা-কলমে লিখিত অনুশীলনের প্রচলন এবং পাঠদানের অভিন্ন পদ্ধতি সে সময়ের প্রেক্ষাপটে ছিল অত্যন্ত অগ্রগামী উদ্যোগ। এসব ব্যবস্থার ফলে সাবাহি মক্তব শিক্ষা কেবল মৌখিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থায় রূপ লাভ করে।
মাওলানা আব্দুল জলিল চৌধুরী (রহ.)-এর আরেকটি যুগান্তকারী অবদান ছিল সাবাহি মক্তব শিক্ষায় কেন্দ্রীয় পরীক্ষাব্যবস্থা চালু করা। তিনি ষান্মাসিক ও বার্ষিক পরীক্ষার পাশাপাশি পাঞ্জম শ্রেণির জন্য একটি অভিন্ন কেন্দ্রীয় চূড়ান্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। একই প্রশ্নপত্রে, একই সময়ে উত্তরপূর্ব ভারতের বিভিন্ন কেন্দ্রে পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে তিনি শিক্ষার মান নির্ধারণে একটি অভিন্ন পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করেন। অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষকদের তত্ত্বাবধানে পরীক্ষাগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় এবং নির্ধারিত সময়ে একসাথে ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এর ফলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অভিভাবকদের মধ্যে জবাবদিহি, শৃঙ্খলা ও প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা সৃষ্টি হয়।
এই ব্যবস্থার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল মেধার যথাযথ মূল্যায়ন। কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ শীর্ষস্থানীয় শিক্ষার্থীদের উত্তরপূর্ব ভারত এমারতে শরীয়ত ও নদওয়াতুত তামীরের বার্ষিক অনুষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে সনদপত্র ও পদক প্রদান করে সম্মানিত করা হয়। একই সঙ্গে তাঁদের সংশ্লিষ্ট মোয়াল্লেমদেরও বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদের মধ্যেও দায়িত্ববোধ, কর্মস্পৃহা এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রতিযোগিতা গড়ে ওঠে।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই শিক্ষাব্যবস্থাও ক্রমাগত আধুনিকায়নের পথে অগ্রসর হয়েছে। সম্প্রতি সাবাহি মক্তবের চূড়ান্ত পরীক্ষায় এমসিকিউ পদ্ধতি প্রবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন জেলার পাঞ্জম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে মডেল এমসিকিউ পরীক্ষাও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আধুনিক মূল্যায়ন পদ্ধতির এই সংযোজন প্রমাণ করে যে, মাওলানা আব্দুল জলিল চৌধুরী (রহ.) যে ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন, তা সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নিজেকে বিকশিত করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। তাঁর প্রবর্তিত কাঠামো আজও উত্তরপূর্ব ভারতের দ্বীনি শিক্ষার অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কার্যকর রয়েছে।
ইতিহাসের একটি তাৎপর্যপূর্ণ বাস্তবতা হলো- যে শিক্ষা সংস্কার একসময় নানা বিরোধিতা ও সংশয়ের সম্মুখীন হয়েছিল, আজ সেই ব্যবস্থাই সর্বজনস্বীকৃত এবং ব্যাপকভাবে অনুসৃত। তাঁর প্রবর্তিত শ্রেণিবিন্যাস, পাঠ্যক্রম, কেন্দ্রীয় পরীক্ষা এবং প্রশাসনিক কাঠামো অনুসরণ করেই আজ অসংখ্য সাবাহি মক্তব পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্য দিয়েই তাঁর দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা এবং সুদীর্ঘ কর্মজীবনের সার্থকতা প্রতিফলিত হয়েছে।
নিঃসন্দেহে বলা যায়, উত্তরপূর্ব ভারতে ইসলামি প্রাথমিক শিক্ষা ও সাবাহি মক্তব ব্যবস্থার আধুনিক রূপায়ণের প্রধান স্থপতি ছিলেন শায়খুল হাদিস হযরত মাওলানা আব্দুল জলিল চৌধুরী (রহ.)। মাত্র কয়েকজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে যে ক্ষুদ্র উদ্যোগের সূচনা হয়েছিল, তা আজ উত্তরপূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে লক্ষাধিক মুসলিম শিশুর দ্বীনি শিক্ষা, নৈতিক চরিত্র গঠন এবং ইসলামি মূল্যবোধ বিকাশের অন্যতম প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। তাঁর কর্ম, চিন্তা ও প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা-দর্শন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
১৯৮৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর সিলেটের এই সূর্যসন্তানের ইন্তেকাল আসামের বদরপুরস্থ আলাকুলিপুরের নিজ বাড়িতে হয়। পরদিন তাঁরই স্মৃতিধন্য আল জামেয়া বদরপুর মাঠে ভারত ও বাংলাদেশের লাখো মানুষের অংশগ্রহণে নামাজে জানাজা শেষে আলাকুলিপুর গোরস্থানে সমাহিত করা হয়। আল্লাহ পাক এই বুজুর্গের দরজা বুলন্দ করুন। আমীন।
লেখক : আসাম সরকারের আদর্শ শিক্ষক পদকপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষিকা, গবেষক ও প্রাবন্ধিক।



