সুদখোরদের যন্ত্রণায় বাড়ি ছাড়া সুরুজ আলী ফিরলেন লাশ হয়ে
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ মে ২০২৬, ৫:৩৭:০৯ অপরাহ্ন
উবাইদুল হক দিরাই (সুনামগঞ্জ) থেকে : সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের মৃত ফকরুল আলীর ছেলে সুরুজ আলী (৫০)। অভাবের সংসার চালাতে গিয়ে এলাকার দাদন ব্যবসায়ীর খপ্পরে পড়েন। গ্রামের কিছু সুদখোরদের কাছে চড়া সুদে টাকা আনেন। যা বছরের পর বছর চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তেই থাকে। কোন একসময় ওই সুদখোরদের ঋণের চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েন তিনি। পরে উপজেলার শ্যামারচর এলাকার আরেক দাদন ব্যবসায়ীর কাছে বাড়ি বন্ধক দিয়ে ২ লাখ টাকা আনেন। অবশেষে চক্রবৃদ্ধি সুদের বোঝা সইতে না পেরে গত তিন বছর আগে ঘরবাড়ি ফেলে পাড়ি জমান সিলেটে। স্ত্রী, তিন ছেলে ও তিন মেয়ে সন্তানকে নিয়ে থাকতেন ভাড়া বাসায়। বড় ছেলেকে সাথে নিয়ে করতেন নির্মাণ শ্রমিকের কাজ।
প্রতিদিনের ন্যায় গত রোববার ঢালাইয়ের কাজ করার জন্য, সিলেট নগরীর আম্বরখানা থেকে একটি ডিআই পিকআপে উঠে অন্যান্য শ্রমিকদের সাথে লালাবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথিমধ্যে তেলিবাজার এলাকায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি।
গত সোমবার সুরুজ আলীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার স্ত্রী ছফিনা বেগম মাটিতে লুটিয়ে কাঁদছেন আর বলছেন ‘ও আল্লাহ গো এখন আমরা কিতা করমু ? বাড়ি বন্ধক দিয়ে টেকা নিছি ২ লাখ। ওই টাকার লাভ দিয়া হারছি ২ লাখ। এরপরেও সুদের আসল টেকা থেকেই যায়। গাওর মাইনসে ঋণ পায়’।
সুরুজ আলীর বাড়ি থেকে বের হয়ে দেখা হয়, পাওনাদার কামরুল ইসলামের সাথে। তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, গ্রামের অনেক মানুষ তার কাছে টাকা পায়। সুরুজ আলী প্রায় ৭ লাখ টাকা ঋণী। এর জন্য বাড়ি বন্ধক দিয়েছিলেন সুরুজ আলী। এরপরেও মানুষের ঋণ দিতে না পেরে একসময় বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আমিও তার কাছে ৩০ হাজার টাকা পাই। দেড়া সুদে দিয়েছিলাম ৫ বছর হয়েছে। সুরুজ আলী আমার এক টাকাও দেয়নি। এখন তার লাশ বাড়িতে আইলে, আমরা গ্রামের মানুষই তার দাফনের ব্যবস্থা করবো’।
কেবল সুরুজ আলী নন, গত রোববার ভোরে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের তেলিবাজার এলাকায় ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে মারা যান দিরাই উপজেলার আরও তিনজন। তারা হলেন, উপজেলার রফিনগর ইউনিয়নের সেচনী গ্রামের বশির মিয়ার মেয়ে মুন্নী বেগম (২৫), ভাটিপাড়া ইউনিয়নের নুরনগরের মৃত নুর সালামের ছেলে ফরিদুল ইসলাম (৩২) ও ভাটিপাড়া গ্রামের রামিন মিয়া (৪০)।
নিহতদের বাড়িতে চলছে কেবলই মাতম। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে চরম অসহায় হয়ে পড়েছেন তিন অবুঝ সন্তানের জননী অন্ত:সত্ত্বা ফরিদুলের স্ত্রী খাদিজা বেগম।
ভাটিপাড়া ইউপি সদস্য নুরনগর গ্রামের শামসুল ইসলাম জানান, আমার চাচাতো ভাই ফরিদুল একজন গরীব মানুষ। কাজ করলে তার সংসার চলতো। এই অভাব অনটন মেটাতে সিলেটে থেকে ঢালাইয়ের কাজ করতো সে। স্বপ্ন ছিল তার পৈতৃক ভিটাতে একটি ঘর করবে। গত দুইদিন আগে সে বাড়িতে এসেছিলো ধান কাটার কাজে। এসময় আমার সাথে কথা হয়, বলেছিল আমার জমির ধান কেটে দেবে। এমন সময় তার স্ত্রীর শারীরিক সমস্যার কারণে সিলেটে চলে যাবে বললে, আমিও বলি তুই চলে যা। ওইদিনই সে সিলেট চলে যায়। আর আজ লাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে তার।
রফিনগরের সেচনী গ্রামের মুন্নী তিন সন্তান রেখে ওই দুর্ঘটনায় মারা যান। তার চাচাতো ভাই হাফিজ আবু জর জানান, প্রায় তিন বছর আগে তিন সন্তানের জননী মুন্নীকে তালাক দেয় তার স্বামী। এরপর বাবার বাড়ি চলে আসে মুন্নী। বাবার অভাবের সংসারের কারণে ছোট ছোট ছেলে মেয়ে নিয়ে পেটের তাগিদে সিলেট চলে যায়। প্রতিদিন যা আয় রোজগার হতো তা নিয়ে কোন রকমে সংসার চলতো মুন্নী বেগমের।
উল্লেখ্য, গত রোববার রাতে নিহতদের লাশগুলো গ্রামে পৌঁছালে স্বজনদের আহাজারিতে পুরো এলাকার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে এবং রাতেই জানাজার পর পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়।




