সিলেটে ই-সিগারেটে ঝুঁকছে উঠতি বয়সী তরুণরা
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ মে ২০২৬, ৫:৫২:১২ অপরাহ্ন
আহমাদ সেলিম
সিলেটে ই-সিগারেট বিক্রি বেড়েছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের এই সিগারেট বা ভ্যাপ বেশী প্রভাবিত করছে। এতে বাড়ছে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি। এই সিগারেট ব্যবহার নিয়ে তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-বলছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। সিলেট নগরীর যে কোনো সড়কে, আড্ডায়, বিপণী বিতানে, চলার পথে তরুণদের হাতে ধোঁয়াবিহীন এক ধরণের সিগারেট দেখা যাচ্ছে। ধীরে ধীরে সেটি পাড়ার আড্ডা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে ই-সিগারেট। নিষিদ্ধ হবার পরও মারাত্মক ক্ষতিকর সেই সিগারেট সিলেটে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে উঠতি বয়সী অবস্থাশালী পরিবারের সন্তানদের মধ্যে এটি এক ধরণের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। অথচ তারাও জানে না, এই ই-সিগারেটে যেসকল উপাদান রয়েছে, সেগুলো ক্যান্সারের কারণ হতে পারে।
চাহিদা বাড়ায় নগরীতে ব্যবসাও বেড়েছে। অধিকাংশ বিপণী বিতানে প্রকাশ্যে বেচাকেনা হচ্ছে ভ্যাপ। অনেকে কসমেটিকস, ইলেকট্রনিক, কাপড়, জুতার দোকানের আড়ালে এই ব্যবসা করছেন। নেশার প্রতি আগ্রহ তৈরী করা ই-সিগারেটের চাহিদা বাড়ার সাথে দুশ্চিন্তাও বাড়ছে সচেতন মহলে।
যদিও এটি ধূমপানের ক্ষতি কমানোর বিকল্প পণ্য হিসেবে দেখা হয়েছিলো। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, ই-সিগারেট ১৫ বার টান দিলে শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১৫ দশমিক ৪ মিলিগ্রাম পর্যন্ত নিকোটিন ফুসফুসে প্রবেশ করে, যেখানে প্রচলিত সিগারেটে সমপরিমাণ শ্বাস নিলে ১ দশমিক ৫৪ থেকে ২ দশমিক ৬০ মিলিগ্রাম নিকোটিন নেওয়া হয়।
আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই ডিভাইস তামাক পোড়ানো ছাড়াই ব্যবহারকারীকে নিকোটিন গ্রহণের সুযোগ দেয়। সাধারণত ভ্যাপারাইজারে থাকা ই-লিকুইড উত্তপ্ত হয়ে বাষ্পে রূপান্তরিত হয়। যেটি উঠতি বয়সী তরুণরা শ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করছে।
সিলেটের অভিজাত বিপণীবিতান থেকে, ছোট দোকানগুলোতে ভ্যাপ বিক্রি বেড়েছে। দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে, তরুণরা এই সিগারেটের বড় ক্রেতা। বিশেষ করে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা। শখের বসে ই-সিগারেট নিতে গিয়ে অনেকে নিয়মিত ধূমপায়ী হয়ে উঠছেন তারা। নিকোটিনের সাথে বিভিন্ন সুগন্ধি ফ্লেভার মিশ্রণ থাকায় সহজে কাছে ভিড়ছেন শিক্ষার্থীরা। ফলে বিভিন্ন ধরণের স্বাস্থ্যঝুঁকির তালিকাভুক্ত হচ্ছে তরুণসমাজ।
অভিযোগ রয়েছে, সরাসরি নয়, কসমেটিকস, কাপড়, জুতা, সিগারেট ব্যবসার আড়ালে ভ্যাপ বিক্রি চলছে সিলেটে। এছাড়াও বিভিন্ন অনলাইন-ভিত্তিক ডেলিভারি ও হোম-ডেলিভারি সেবা চালু রয়েছে ই-সিগারেটের।
ব্যবহার বাড়ায় পাড়ায় পাড়ায় আড্ডাও বেড়েছে। সন্ধ্যার পর কিশোর, তরুণরা দলবদ্ধ হয়ে সেটি ব্যবহার করছেন। একসময় এই কিশোর-তরুণরাই অপরাধ কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে। হঠাৎ করে এই সিগারেট ব্যবহার বাড়লেও অনেক অভিভাবক সে সম্পর্কে মোটেও অবগত নন। এতে সন্তানরা পিতা-মাতার অগোচরে আরো বেশী বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তবে শুধু সিলেটেই নয় এখন অন্যান্য জেলা শহরেও ভ্যাপের বাজার ছড়িয়ে পড়েছে।
এদিকে ই-সিগারেট যখন তরুণ সমাজের মধ্যে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ার আশংকা দেখা দিয়েছে, সে সময় সরকারের পক্ষ থেকে দু:সংবাদ দেয়া হয়েছে। গত ১০ এপ্রিল (২০২৬) জাতীয় সংসদে ই-সিগারেট, ভ্যাপ, নিকোটিন পাউচসহ ইমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্ট নিষিদ্ধের বিধান বাতিল করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল।
সিলেট ওসমানী হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক জানিয়েছেন, ই-সিগারেটে নিকোটিন ছাড়াও বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ যেমন- ফরমালডিহাইড, অ্যাসিটালডিহাইড এবং ভারী ধাতু থাকতে পারে। যা দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসযন্ত্র ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সিলেট নগরীর আল হামরা শপিং সিটি, হকার্স মার্কেট, মিলেনিয়াম, ওয়েস্ট ওয়ার্ল্ড এবং বন্দরবাজারের বেশ কয়েকটি দোকানে ভ্যাপ বিক্রি হচ্ছে। ভ্যাপের দাম সাধারণত সাড়ে ৩ হাজার থেকে শুরু করে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। আর সঙ্গে আছে ই-লিকুইড, যার দাম ৫০০ থেকে শুরু করে ৩ হাজার টাকা। চীনা ও ক্লোন ভ্যাপগুলোর দাম ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকার মধ্যে। আর ই-লিকুইডগুলোর দাম ১৫০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত।
প্রকাশে বেচাকেনা হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, সিলেট মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সভাপতি আব্দুর রহমান রিপন। তিনি বলেন, আমি নিজেও দেখছি বিভিন্ন মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে কম বয়সী ছেলেরা ভ্যাপ ব্যবহার করছে। যা দেখতেও খারাপ লাগে। এটি প্রকাশ্যে বিক্রি বন্ধে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা সবগুলো মাকের্টের সাথে বিষয়টি নিয়ে বসবো।’
সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোলজী বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এস এম আসাদুজ্জামান জুয়েল বলেন, ই-সিগারেট তরুণসমাজকে বেশী প্রভাবিত করছে। ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ার আগে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক, ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা. সরদার বানিউল আহমেদ এর সাথে। তিনি বলেন, ‘ই-সিগারেটেও নিকোটিন আছে। তরুণরা নিয়মিত ব্যবহার করলে শারীরিক অন্য সমস্যার সাথে ক্যান্সারও হতে পারে।’
যোগাযোগ করা হলে সিলেট বিভাগীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অফিসের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মজিবুর রহমান পাটওয়ারী জানান, ‘ই-সিগারেট স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তবে এটি মাদকদ্রব্য আইনে অন্তর্ভূক্ত হয়নি। আমরা বিষয়টি সিডিউলভূক্ত করতে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেছি।’




