সুবিপ্রবি’র ভিসি নিয়োগে আইন লঙ্ঘন : ভিসি’র শিক্ষাজীবন নিয়ে নানা গুঞ্জন
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ৪:৩৬:৩৩ অপরাহ্ন
কাউসার চৌধুরী
সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (সুবিপ্রবি)-র ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) নিয়োগে একইসাথে যোগ্যতা ও বিশেষায়িত আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে কেবল সুনামগঞ্জ নয় পুরো সিলেট অঞ্চলে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। বিষয়টি আইনগতভাবে সুরাহা করে বৈধ উপায়ে যোগ্য ভিসি নিয়োগেরও দাবি জানানো হয়েছে। দ্রুত এর সুরাহা না হলে ক্ষুব্ধ সুনামগঞ্জবাসী আন্দোলনে যাবারও হুমকি দিয়েছেন।
বিতর্ক উঠেছে, ভিসি অধ্যাপক ড. মো. জাকির হুসাইনের শিক্ষাজীবন নিয়ে । মাত্র ১২ বছর বয়সে তার দাখিল পাশ করার বিষয়টি অনেক প্রশ্নের উদ্রেক করেছে।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন’র সুনামগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক ফজলুল করিম সাঈদ সিলেটের ডাককে বলেন, সুবিপ্রবি’র ভিসি নিয়োগ উক্ত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন আইনের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন। আমার জানা মতে, অতীতে বাংলাদেশের সকল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ের অধ্যাপক ছাড়া ভিসি নিয়োগ হয়নি। এখানে আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ঘটেছে। ভিসির ব্যক্তিগত কোয়ালিফিকেশন সংক্রান্ত অনেক অসঙ্গতি রয়েছে-যা কাম্য নয়।
ভিসি নিয়োগে সুবিপ্রবি আইন লঙ্ঘন
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, সুবিপ্রবি’র উপাচার্য পদে গত ২৭ জুলাই সোমবার কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মো. জাকির হুসাইনকে নিয়োগ দেয় শিক্ষামন্ত্রণালয়।
নিয়োগের দু’দিনের মধ্যে ২৯ জুলাই বুধবার ভিসি পদে তিনি যোগদান করেন। তাকে সুবিপ্রবি আইন সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করে নিয়োগ দেয়া হয়। এ নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সুনামগঞ্জ, সিলেটেও নানান সমালোচনা চলছে।
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের মূল আইনি ভিত্তি হলো সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইন বা অধ্যাদেশ। এসব আইনে বলা থাকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি উপাচার্য নিয়োগ করবেন। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানে গবেষণাগার পরিচালনা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতার মতো বিশেষায়িত কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট খাতের বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। এজন্যে সুবিপ্রবিরও নিজস্ব আইন রয়েছে।
২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনকল্পে প্রণীত আইন গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। আইনের ১০ নম্বর ধারায় ভিসি নিয়োগের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
সুবিপ্রবি’র আইন, ২০২০-এর ১০(১) ধারায় বলা আছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিকে’ উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে।
এই ধারার উপধারা-২ এ বলা হয়েছে, “আচার্য (রাষ্ট্রপতি), তৎকর্তৃক নির্ধারিত শর্তে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে স্বনামধন্য একজন শিক্ষাবিদকে চার বছরের জন্য উপাচার্য পদে নিয়োগ দেবেন। তবে কোনো ব্যক্তি একাধিক্রমে বা অন্য কোনোভাবে দুই মেয়াদের বেশি উপাচার্য পদে যোগ্য হবেন না।”
অথচ যাকে ভিসি পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তিনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি নন ; তিনি হাদিস বিভাগের অধ্যাপক। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে ভিসি নিয়োগ না দেওয়ায় ড. জাকিরকে নিয়ে নানা গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, বিএনপি সরকার গঠনের পর সুবিপ্রবির উপাচার্য নিয়োগের সার্চ কমিটির সংক্ষিপ্ত তালিকায় ড. জাকিরের নাম ছিল না। তালিকায় নাম না থাকার পরেও নিয়োগ দেয়ার বিষয়টি শিক্ষা সংশ্লিষ্টদেরকে ভাবিয়ে তুলেছে। এর রহস্য উদঘাটনেরও দাবি জানানো হয়েছে।
ভিসির শিক্ষাজীবন নিয়ে গুঞ্জন
এদিকে, অধ্যাপক জাকির হুসাইনের জীবন বৃত্তান্ত ঘেঁটে তার শিক্ষাজীবনের কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। তার মধ্যে আছে, মাত্র ১২ বছর বয়সে মো. জাকির হোসাইনের দাখিল (এসএসসি সমমান) পাস করার বিষয়টি। এ নিয়ে শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মনে বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
এছাড়া, একই বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) থেকে স্নাতক ও মাদ্রাসা-ই-আলিয়া (ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা) থেকে তার কামিল পাস করা নিয়েও বেশ গুঞ্জন আছে।
জীবনবৃত্তান্ত অনুযায়ী, জাকির হুসাইন ১৯৬৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার বোয়াইলমারী কামিল মাদ্রাসা থেকে তিনি দাখিল পাশ করেছেন। ১৯৮৫ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগ থেকে স্নাতক এবং ঢাকার মাদ্রাসা-ই-আলিয়া থেকে কামিল পাশ করেন।
১৯৭৫ সালে দাখিল, ১৯৭৭ সালে আলিম, ১৯৭৯ সালে ফাজিল এমনকি ১৯৮১ সালে কামিল হাদিস, ১৯৮৩ সালে কামিল ফিকহ, ১৯৮৫ সালে কামিল তাফসির বিভাগসহ উপরোক্ত সবক’টি পরীক্ষায় তিনি দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। আবার ১৯৮৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবী বিভাগে বিএ অনার্স ও ১৯৮৬ সালে আরবী বিভাগে এমএ ফার্স্ট ক্লাশ পান। একই সালে কামিল ও বিএ অনার্স পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে উত্তীর্ণ হন।
জীবনবৃত্তান্তের সকল তথ্য ভুল না সত্য জানতে চাইলে ড. জাকির বলেন,সবই সত্য।
তিনি বলেন, ‘কোনো কিছু গোপন করিনি।
মাত্র ১২ বছর বয়সে দাখিল পাশ করার বিষয়ে শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তারা জানিয়েছেন, দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় দাখিল বা এসএসসি সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিতে সাধারণত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে মোট ১০ বছর পড়াশোনা করতে হয়। সেই হিসাবে ৫ বছর বয়সে ভর্তি হলেও ১২ বছর বয়সে সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নের কথা। তাঁর দাখিল পাশের তথ্যটি দেশের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমের তুলনায় একটি অস্বাভাবিক ঘটনা বলে অনেকেই মনে করছেন।
অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখা হবে
ভিসির দাখিল পাশের এই অস্বাভাবিক বিষয়ে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) যোগাযোগ করা হলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সংশ্লিষ্টরাও বিস্ময় প্রকাশ করেন। ইউজিসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখা হবে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বে থাকা ইউজিসির পূর্ণকালীন সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুনের নজরে দেয়া হলে তিনি বলেন, এ রকম কোনো অভিযোগ যদি কমিশনকে জানানো হয়, তাহলে ইউজিসি সেটি খতিয়ে দেখবে।
এই ভিসি নিয়োগ হাস্যকর
সুবিপ্রবির এই ভিসি নিয়োগকে হাস্যকর বলে উল্লেখ করেছেন ভিসি নিয়োগে সার্চ কমিটির সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান। ইউজিসির সাবেক এই সদস্য বলেন, এটি হাস্যকর। এ থেকে বোঝা যায়, যারা বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য পদের দায়িত্ব তাকে দিয়েছেন, তারা বিশ্ববিদ্যালয়টির আইন সম্পর্কে অবগত নন। একটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য পদের দায়িত্ব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রের একজন শিক্ষাবিদেরই পাওয়া উচিত। যতদূর জানি আইনেও সেরকমটা আছে। কারণ- ওই প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়টিকে নেতৃত্ব দিতে সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের যে ধরনের গবেষণা, প্রশিক্ষণ বা যোগ্যতা প্রয়োজন, তা অন্যদের থাকবে না, সেটাই স্বাভাবিক।”
ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান যা বললেন
সুবিপ্রবির ভিসি নিয়োগের বিষয়ে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সংক্রান্ত যেসব বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, সেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞ বা সংশ্লিষ্ট মানুষই আসবেন- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
ভিসি জাকির হুসাইনের বক্তব্য
জানতে চাইলে সুবিপ্রবির ভিসি অধ্যাপক ড. মো. জাকির হুসাইন বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় আইনে উপাচার্য নিয়োগের বিষয়ে যাই থাকুক না কেন, চ্যান্সেলর হিসেবে রাষ্ট্রপতি যাকে উপাচার্য পদের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হবেন, তিনিই এ দায়িত্ব পাবেন।”
জন্ম সন ও দাখিল পাশের বিষয়ে ভিসি অধ্যাপক ড. জাকির হুসাইন বলেন, এটা অসংগতি নয়। তখনকার নিয়ম অনুযায়ী মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্টরা এটা করেছে। তারাই বয়স লিখে দিতেন। আমাদের সময় আমাদের বয়স লেখাও ছিল না কোথাও। এগুলো সবসময় স্কুলের প্রধান বা সুপারিনটেনডেন্টরাই লিখে দিতেন। এটা ছাত্রদের কাউকে তারা জিজ্ঞাসাও করতেন না।’
একই সালে ডাবল ডিগ্রির বিষয়ে ড. জাকির বলেন, ‘কামিল আমি ১৯৮৫ সালেই পাস করেছি। কিন্তু অনার্সে ১৯৮৫ লেখা থাকলেও আমি পরীক্ষা দিয়েছি ১৯৮৮-তে এবং রেজাল্ট হয়েছে ১৯৮৯-এ। সে সময় সেশন জট থাকায় আমাদের পরীক্ষা দেরিতে হয়েছিল। এখানে পাশ করার সেশন ১৯৮৫ দেওয়া থাকলেও সে সময় ভর্তিও ১৯৮৫-তে হয়নি। তার মানে এখানে কোনো অসংগতি নেই।’
তিনি বলেন, এটা আমি জীবনবৃত্তান্তে লিখেছি। কারণ এটা যদি আমি না দিতাম, তাহলে প্রশ্ন উঠত আপনি তো পাশ করছেন ওইটা, তাহলে লেখেননি কেন। আমার ওইটা তো দরকার পড়েনি। আমার দরকার হলো অনার্স-মাস্টার্স। ওইগুলো শুধু আমি জীবনীতে লেখার জন্য লিখছি। ওইগুলায় পাস করার জন্যই যে আমার যোগ্যতা হয়েছে- আর না থাকলে হতো না, এমন তো না। আমার যোগ্যতার জন্য দরকার অনার্স-মাস্টার্স। এটা দিয়েই আমি চাকরি নিয়েছি। আমার কিছুই আমি গোপন রাখিনি। ভিসি পদে সরকার যখন নিয়োগ দেয়, তখন দেখেশুনেই দেয়। যেহেতু আমি সিভি দিয়েছি, আমার সিভি দেখেই তো আমাকে নিয়োগ দিয়েছে।



