বৃষ্টির ছোঁয়ায় অপরূপ সাজে সিলেটের পর্যটনকেন্দ্র
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২১ মার্চ ২০২৬, ১০:৩১:৩০ অপরাহ্ন
লবীব আহমদ
শীতের শুষ্কতা কাটিয়ে অবশেষে সিলেটে নামল স্বস্তির বৃষ্টি। আর এই অঝোর ধারায় নতুন যৌবন ফিরে পেয়েছে সিলেটের প্রকৃতি ও পর্যটনকেন্দ্রগুলো। ধূসর পাহাড় এখন সতেজ সবুজ, আর ঝরণাগুলোতে ফিরেছে চঞ্চলতা। জাফলং থেকে ভোলাগঞ্জ- সবখানেই এখন জলরাশির কলতান। প্রকৃতির এই নতুন রূপ দেখে আসন্ন ঈদুল ফিতরের ছুটিতে রেকর্ডসংখ্যক পর্যটক সমাগমের আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
সিলেটের সৌন্দর্য মূলত প্রাকৃতিক। এই প্রাকৃতিক দৃশ্য অবলোকন করার জন্য দেশের পাশাপাশি বিদেশে থেকেও পর্যটকেরা আসেন। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য মূলত দেখা যায় বর্ষাকালে বেশি। বৃষ্টি বা বর্ষাকাল না থাকলে সিলেটের অধিকাংশ পর্যটনকেন্দ্র মরা হয়ে থাকে অনেকটা। যার কারণে প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগের জন্য অপেক্ষা করতে হয় বৃষ্টি বা বর্ষাকালের। আর সিলেটে এমনিতেই দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বৃষ্টি বেশি হয়। সেজন্য পর্যটকেরা সিলেটে ঘুরতে আসেন। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। শীতের শুষ্কতা কাটিয়ে টানা ৪/৫ দিনের বৃষ্টিতে প্রাণ ফিরে পেয়েছে সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলো। যেখানে পানি ছিল না বা অল্প ছিল, সেখানেও এখানে পানি আছে এবং অনেকটা বেড়েছে। যা পর্যটকদের আকৃষ্ট করবে। কয়েক দিনের বৃষ্টিতে সিলেটের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র জাফলং, সাদাপাথর, রাতারগুল, উৎমা ছড়া, তুরুং ছড়া, বিছনাকান্দি এবং পান্তুমাই ঝরনাগুলো প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। পাথর আর স্বচ্ছ জলের মেলবন্ধনে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বৃষ্টির পর পাহাড়ের গা বেয়ে নামা ঝরনার ধারাগুলো এখন দেখার মতো অবস্থায় আছে। এদিকে বৃষ্টিতে সিলেটের চা-বাগান গুলোতেও প্রাণ ফিরে এসেছে। মরা পাতা এবার সতেজ হয়েছে। যা পর্যটকদের আকৃষ্ট করবে। বিশেষ করে মালনীছড়া চা-বাগান, আলী বাহার চা-বাগান, তারাপুর চা-বাগানের দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ পর্যটকেরা উপভোগ করতে পারবেন ঈদে।
এদিকে, পর্যটকদের বরণে প্রস্তুত রয়েছেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তারা আশা করছেন, দীর্ঘদিনের খরা কাটিয়ে উঠতে পারবেন এই ঈদে। নির্বাচন, রমজানের সময়ে মোটেও ব্যবসা হয়নি, যার কারণে ঈদের অপেক্ষায় তারা।
সাদাপাথরের হোটেল আল বেলার মালিক লিটন মিয়া জানান, রমজানের পুরো মাস পর্যটকেরা আসেন না। আর এর আগেও নির্বাচন সহ নানা ঝামেলায় পর্যটকদের আগমন সাদাপাথরে খুব কম ছিল। এখন ঈদে পর্যটকদের সমাগম ভালো হবে বলে আমরা আশাবাদী। এজন্য দোকান মেরামত সহ সকল প্রস্তুতি নিচ্ছি।
মো. ইব্রাহীম আলী নামে সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্রের একজন ফটোগ্রাফার জানান, রোজায় কখনো ব্যবসা হয় না, মানুষজন আসে না। আর এর আগেও তেমন পর্যটক আসেননি। তবে, ঈদে পর্যটক আসেন, ছবি তুলেন আমাদের ক্যামেরা দিয়ে। আমরা মোটামুটি ব্যবসা করতে পারি। এবার ঈদেও আশায় রয়েছি।
জাফলং পর্যটন কেন্দ্র ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হোসেন মিয়া জানান, ঈদে দেশ-বিদেশের প্রচুর পর্যটক আসেন জাফলংয়ে। তখন আমাদের ভালো ব্যবসা হয়। আমরা আশা করছি এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। বৃষ্টির আগে খরা থাকায় পর্যটক কম ছিল। কিন্তু এখন প্রকৃতি সতেজ হওয়ায় আমরা আশা করছি গত কয়েক মাসের ক্ষতি এবার পুষিয়ে নিতে পারব।
এদিকে পর্যটকদের অপেক্ষায় ধুয়ে মুছে সাফ করা হচ্ছে তাদের বহন করা নৌকাগুলো। সিলেটের বেশিরভাগ পর্যটনকেন্দ্রেই নৌকা করে যেতে হয়। সেজন্য গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ এলাকার নৌকার মাঝিরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। তাদের মতে, পানি বাড়ায় নৌকা চলাচলে সুবিধা হবে এবং পর্যটকরাও পাহাড় ও ঝরনার একদম কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবেন।
রাতারগুল নৌকাঘাটের আল আমিন জানান, আমাদের এখানে তিনটি নৌকা ঘাট। আমাদের ঘাটে ১২০ টি নৌকা রয়েছে। সবগুলো নৌকাই ভালোভাবে মেরামত করা হয়েছে। এখন শুধু পর্যটকদের আগমনের অপেক্ষায় আমরা।
সিলেট জেলা পুলিশ জানায়, ঈদে পর্যটক বরণে প্রতিবছরই পুলিশ টহল জোরদার করা হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। আমাদের টহল জোরদার রয়েছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ট্যুরিস্ট পুলিশ থাকবে আর জেলা পুলিশ টহলে থাকবে। প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন এবং লাইফ জ্যাকেটসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি আবু তাহের মো. শোয়েব বলেন, ঈদ উপলক্ষে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত সিলেটের হোটেল-মোটেল প্রায় ৬৫ ভাগের মতো বুকিং হয়েছে। বাকি দিনগুলোর মধ্যে আশা করি পুরোপুরি পূর্ণ হবে। আর রমজান তো ইবাদতের মাস, সেজন্য মানুষজন ঘুরতে ততটা আসে না। ঈদ বা লম্বা ছুটি হলেই সিলেটে প্রচুর পর্যটকের সমাগম ঘটে। এতে করে ব্যবসা হয়।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রবিন মিয়া জানান, বৃষ্টিতে সাদাপাথরে পানি আসছে, সৌন্দর্য আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। সাদাপাথর সহ কোম্পানীগঞ্জে পর্যটক বরণে আমাদের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। সাদাপাথরে ট্যুরিস্ট পুলিশ থাকবে আর থানা পুলিশ টহলে থাকবে। আমাদের মেডিকেল টিমও থাকবে সেখানে।
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী জানান, পর্যটক বরণে আমরা প্রস্তুত। উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ, বিজিবি সহ আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা প্রস্তুত রয়েছেন। এবছর লম্বা ছুটিতে প্রচুর পর্যটক গোয়াইনঘাটে আসবেন বলে আমরা আশাবাদী। পর্যটকদের যাতে কোনো সমস্যা না হয়, সেজন্য আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আশা করছি পর্যটকেরা নির্বিঘ্নে ঘুরে যেতে পারবেন।




