ভ্রমণ
ঘোড়ায় চড়িলেন গোডিভা
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ৬:১৮:০০ অপরাহ্ন
মোয়াজ আফসার :
টাওয়ারের চূড়ায় বিশাল এক ঘড়ি। এর খানিকটা নীচে ছোট্ট একটা জানালা অনেকটা পায়রার খোঁপের মতো। আর তার নীচে বাষট্টি ইঞ্চি এলইডি সাইজের আরো একটা বড় জানালা। তার দুই পাশে দুটি স্লাইডিং দরজা। চূড়ার ওই ঘড়ির কাঁটা দুপুর একটা ছোঁয়ার সাথে সাথে ঢং শব্দে আওয়াজ তুলতেই জীয়ন কাঠির যাদুর পরশে যেন দরজাগুলো সরে দাঁড়ায়। দেখা দেয় সম্পূর্ণ নগ্নদেহী এক নারী সাদা একটি ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে ডান দরজা দিয়ে বের হয়ে বামের দরজায় গিয়ে ঢুকে। ঠিক তখুনি ওপরের ওই ছোট্ট জানালাটির কপাট খুলে এক দুষ্টু বেটা মানুষ লুকিয়ে এ দৃশ্য দেখে। এটি প্রতি ঘন্টায় একবার মঞ্চায়ন হয়। দেখার জন্য মানুষজন দাঁড়িয়ে থাকে, অপেক্ষা করে। আমরাও দাঁড়াই গিয়ে। নিপুণ যান্ত্রিক কারিশমায় পুতুল দিয়ে সাজানো এ কাহিনীর এখানেই শেষ। বন্ধ হয়ে যায় সবক’টি জানালা। সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত দর্শকের মাঝে একঝাক পায়রার ডানা ঝাপটে উড়াল দেয়ার মতো করতালির ঝড় ওঠে। এ দৃশ্যগুলো বাস্তব নয়, কিন্তু এই দৃশ্যের ঘটনা এবং চরিত্রগুলো সত্য। বিজ্ঞাপনচিত্রের মতো মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নির্মাতা এই প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন এক হাজার বছর আগের একটি মরচে ধরা ঘটনা। এর একটা ইতিহাস আছে। কিংবদন্তীর মতো হয়ে ওঠা ওই ইতিহাস মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিতে জীবন্ত করে ধরে রাখা হয়েছে ওখানে। মানুষ যেন তার শেকড় খনন করে। ফেসবুকের মতো যদি কোন ঈগল চোখ তখোন আকাশে উড়ে বেড়াতো ঘটনাটি মুহূর্তে পৌঁছে যেত অযুত নিযুত মানুষের দোরে। ঘটনাটি আমাকে বেশ আকৃষ্ট করে। আমি এর পেছনে ছুটি।
গল্পটা হাজার বছর আগের। একাদশ শতাব্দীর। ইংল্যান্ডের কোভেন্ট্রি শহরে। কোভেন্ট্রি এবং অক্সফোর্ড শহরের মাঝামাঝি ছোট্ট এক শহর বানবারি। ওখানে আমার মামার বাসা। মামার বাসায় আমি দিনকয়েকের নাইওরী। ওখানে আমার মামাতো ভাই বোনেরা আছে। বড় ভাই রিপ্তা করিমও ওখানে থাকে। কাজের ফাঁকে ওরা আমাকে নিয়ে বিভিন্ন দর্শনীয় জায়গা ঘুরতে যায়। এরকমই একদিন মামাতো ভাই সুহেদ জাহেদ আর আমার ভাই আমাকে কোভেন্ট্রি শহর দেখাতে নিয়ে বেরোয়। সুহেদ আমাদের গাড়ীর চালক। ড্রাইভিং পাশ করেছে মাত্র। ছোট বয়স তাই ওর ড্রাইভিং নিয়ে আমার মনে একটা ভীতি ছিলো। কিন্তু ওর স্টিয়ারিংয়ের ঘোরানি প্যাঁচানি দেখে সে ডর বেশি সময় স্থায়ী হয়নি। বৃটিশ লাইসেন্স তো আর এমনি দেয়া হয়না। কতগুলো লেসন নিতে হয়। তারপর টেস্ট। নিখুঁত না হলে পাস করা যে কত কঠিন তা জানেন যারা এ জালে আটকা পড়েছেন। ওর দক্ষ চালনায় আধা ঘণ্টার মধ্যেই কোভেন্ট্রি শহরে পোঁছি। ঘড়ির কাটা তখোন দুপুর একটায় যাইযাই। কোভেন্ট্রি শপিং সেন্টারে গম গম করা মানুষ। টাওয়ারের নীচেও বড় জটলা। আমরা দাঁড়াই গিয়ে ওই জটলায়। চোখ দুটো স্থির করে রাখি ঘড়িতে। টাওয়ারের ঘড়ি ঢং শব্দে বেঁজে ওঠতেই দরজাগুলো খুলে যায়। দেখা দেয় সেই আকাক্সিক্ষত দৃশ্য। দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষা মাত্র কয়েক মুহূর্তে লিন হয়। কপাটগুলো বন্ধ হয়ে যায়।
গল্পটা লেডি গোডিভার। গোডিভা ছিলেন খুব সুন্দরী সম্ভ্রান্ত আর ধর্মপরায়ণ মহীয়সী এক নারী। কোভেন্ট্রির জমিদার লর্ড লিওফ্রিকের স্ত্রী। যুগটি ছিলো আ্যাংলো সেক্সন গোত্রের। পুরো ইংল্যান্ডজুড়ে তাদের রাজত্ব। স্বামী স্ত্রী দুজনই ছিলেন অভিজাত এই গোত্রের লোক। লিওফ্রিক এবং গোডিভা দুজনই ছিলেন প্রজাদের খুব প্রিয়। সবসময়ই তারা প্রজাদের সুখদুঃখের অংশীদার হতেন। গোডিভা চাইতেন প্রজাদের নিয়ে সুন্দর এক রাজ্য গড়ার। যে রাজ্যে মানুষ সুখে শান্তিতে দিন গুজরান করবে। হাসবে গাইবে ছবি আঁকবে। বিপত্তি ঘটে রাজকোষে যখন অর্থের টান পড়ে। রাজ্যের উন্নয়নের জন্য টাকার প্রয়োজন। কিন্তু টাকা আসার তো পথ নেই। তাই লিওফ্রিক প্রজাদের কাছ থেকে কর আদায় করে রাজ্যের উন্নয়নের সিদ্বান্ত নেন। কিন্তু প্রজারা ছিলো খুব গরীব। কর দেয়ার মতো অবস্থা তাদের ছিলো না। গোডিভা প্রজাদের মনোজগৎ তাত্ত্বিকের মতো গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন। বুঝতে পেরেছিলেন প্রজাদের ওপর করের এ বোঝা কত বড় অভিশাপ, কত ভারী। যা বহন করা প্রজাদের পক্ষে অসম্ভব। তাই গোডিভা করের এ আদেশ উঠিয়ে নেয়ার জন্য স্বামী লিওফ্রিককে অনুরোধ জানান। কিন্তু রাজার সোজাসাপটা জবাব- কর আদায় ছাড়া রাজ্য চলবে কেমন করে? রাজ্যের কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ভাতাইবা আসবে কোথা থেকে! তাই লিওফ্রিক গোডিভার এ অনুরোধ গ্রহণ করতে পারলেন না। গোডিভা নাছোড়। প্রজাদের ঘাড় থেকে করের এ বোঝা নামাতে স্বামী লিওফ্রিককে ক্রমাগত চাপ দিতে থাকেন। এক ধরনের দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন। অন্দরমহলের এ দ্বন্দ্ব মেটাতে লিওফ্রিক মনে মনে এক ফন্দী আঁটেন। তিনি স্ত্রী গোডিভাকে এক কঠিন শর্ত দিয়ে বসেন। গোডিভা যদি সম্পূর্ণ নগ্ন শরীরে ঘোড়ার পিঠে চড়ে কোভেন্ট্রি শহর ঘুরতে পারে, তবে তিনি প্রজাদের ওপর থেকে করের আদেশ উঠিয়ে নেবেন।
রাজার এমন অদ্ভুত শর্তে গোডিভার হৃদয় ভেঙ্গে খান খান হয় ভূকম্পনে বিধ্বস্ত নগরীর মতো। শিকারির তীর খাওয়া হরিনীর মতো ছটফট করতে থাকেন। রাগে দুঃখে ক্ষত বিক্ষত গোডিভা রাজার সমুখ থেকে কোনভাবে নিজেকে আড়াল করেন। রাজ্যের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি স্বামীর এমন সওদা নিজের অস্থিত্বকেই বিপন্ন করে তুলে। তার মুকুট থেকে বড়াই করার পালকটি যেন খসে পড়ে। রাজার দেয়া এমন নির্লজ্জ শর্ত তার শরীরে কাটা দিতে থাকে বারবার। কিন্তু প্রজাদের এ কঠিন অবস্থা থেকে রেহাই দিতে আপোসহীন গোডিভা শেষ পর্যন্ত ওয়ান ম্যান আর্মির মতো মনস্থির করেন রাজার শর্ত মেনে নেবেন। এ শর্ত পালন ছিলো অত্যন্ত কঠিন। তবু কঠিনেরেই ভালবাসিলেন। এ নিয়ে রাজ্যের মানুষের সঙ্গে বাতচিত করলে প্রজারা আবেগপরায়ণ হয়ে ওঠে। গোডিভা ঘোড়াতে চড়াকালীন সময় সবাইকে নিজ নিজ ঘরের দরজা জানালা বন্ধ রাখার অনুরোধ জানান তিনি। অতঃপর গোডিভা রাজাকে জানিয়ে দেন তিনি ঘোড়ায় চড়বেন। বার্তাটি ছিলো চ্যালেঞ্জে ভরা, ছিলো জেদের স্ফুলিঙ্গ ছড়ানো। স্ত্রীর এ সিদ্বান্ত লিওফ্রিকের রাজ্য কাঁপিয়ে দিলো ছোটখাটো এক ভূকম্পনের মতো। তিনি ভাবতেও পারেননি গোডিভা তার এমন শর্ত মেনে নেবেন। ব্যর্থ হলো রাজার কূটকৌশলের সব মুনশিয়ানা। বাজিতে হার হলো তার। এ পথ থেকে সরে আসতে স্ত্রীকে নানাভাবে বুঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু হলোনা কিছুই। গোডিভা তার লক্ষ্যে অটুট। প্রেম শুধু কাছেই টানেনা দূরেও ঠেলে দেয়। একটি মাত্র শর্তের কারণে গোডিভা লিওফ্রিকের কাছ থেকে যোজন যোজন দূরে ছিটকে পড়েন। শেষ পর্যন্ত লিওফ্রিক বিনা শর্তেই গোডিভার দাবি মেনে নেয়ার ঘোষণা দেন। কিন্তু লিওফ্রিকের এই ঘোষণা বিধ্বস্ত গোডিভার ভাঙ্গা হৃদয় জোড়া দিতে পারেনি। গোডিভা তার সিদ্বান্তেই অটল থাকেন। স্বামী লিওফ্রিকের কঠিন এবং নির্মম শর্ত আগেই তার হৃদয় ভেঙ্গে খান খান করে দিয়েছিল। লিওফ্রিকের সামনে এখন আর কোন পথ খোলা রইলো না।
এরপর একদিন ভোরে সূর্য যখন পৃৃথিবীকে আলোকিত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখুনি গোডিভা সম্পূর্ণ নগ্ন শরীরে ঘোড়ার পিঠে চড়েন। তার মাথার লম্বা চুল দিয়ে শরীরের সামনের অংশে ছড়িয়ে দিয়ে প্রদক্ষিণ করেন কোভেন্ট্রি শহর। প্রজারা গোডিভার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা দেখাতে সবাই ঘরের দরজা জানালা বন্ধ রাখে। এক দর্জি ছিলো এ ঘটনার ব্যতিক্রম। তার নাম টম। গোডিভা যখন ঘোড়ায় চড়েন তখন ওই দর্জি তার জানালা খুলে বাইরে উঁকি দেয়। পরে ধরাও পড়ে। রাজদরবারে তার বিচার হয়। সাজাও হয়। তার চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছিল, নাকি মৃত্যুদণ্ড এর সঠিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। সেই তখন থেকে পিপিং টম শব্দটির উৎপত্তি। গোপনে উঁকি দিয়ে অন্যের গোপন কর্মকাণ্ড দেখাকে পিপিং টম বলে। গোডিভার এ প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত প্রজাদের স্বার্থ রক্ষিত হয়েছিল কিনা সে সম্পর্কে কিছু জানা না গেলেও গোডিভা মাঠে মাঠে কৃষাণের মুখে ঘরে ঘরে কৃষাণির বুকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে ঠাঁই করে নিয়েছিলেন। যার প্রভাব দেখা যায় কবি সাহিত্যিক এবং শিল্পীেদর তাদের শিল্পকর্মে। গোডিভার বিশাল আকারের একটি ভাস্কর্য দেখা যায় কোভেন্ট্রি শহরের একেবারে কেন্দ্রস্থলে। ব্রোন্জের তৈরি এ ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেন স্কটিশ ভাস্কর স্যার উইলিয়াম রেইড ডিক। ঘোড়ার পিটে বসে আছেন নগ্ন গোডিভা। শরীরের সামনের অংশ ঢেকে রেখেছেন তার লম্বা চুল দিয়ে। নীচে পাথর স্তম্ভের গায়ে আলফ্রেড লর্ড টেনিসনের বিখ্যাত কবিতা গোডিভের ক’টি লাইন খোদাই করে লেখা-
“THEN SHE RODE BACK CLOTHED ON WITH
CHASTITY SHE TOOK THE TAX AWAY
AND BUILT HERSELF AN EVERLASTING NAME”
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘গোডিভা’ একটি বেশ জনপ্রিয় ব্রান্ড নেম। এই ব্রান্ডের পণ্যসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে নামীদামী চকোলেট, কফি, মদ এবং অন্যান্য প্রসাধনী যেগুলো বাজারে বেশ উঁচুদরে বিক্রি হয়। কিন্তু কে এই গোডিভা, খুব কম লোকই চেনে। অনেকে আবার জানে, কিন্তু গোডিভা গল্পের শক্ত কোনও দলিল আর্কাইভে নাই বলে ঘটনাটির আসল সত্য প্রতিষ্ঠা পায়নি। মানুষ এটিকে নেহায়েত একটি মিথ বলেই গণ্য করে। এরপরেও কোভেন্ট্রিতে প্রতি বছর গোডিভা ফেস্টিভ্যাল উদযাপন হয়। যেটিই হোক গোডিভার প্রতিবাদী চরিত্র, সাহসী ও দৃঢ় মনোবল এবং স্বার্থের ওপরে ওঠে নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার মানসিকতা থেকে মানুষ অনুপ্রেরণা পায় যুগ যুগ ধরে। উপাখ্যানটি গত এক হাজার বছরে কেবল তার ডালপালাই মেলেনি মানুষেরে নিরন্তর শুনিয়ে গেছে মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে। একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?




