সারাদেশে পাথর কোয়ারি চলবে আর সিলেটে চলবে না, এটা হবে না : বিভাগীয় কমিশনার
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১০ জুলাই ২০২৫, ১২:১৬:৩১ অপরাহ্ন
স্টাফ রিপোর্টার: ‘সারাদেশে পাথর কোয়ারি চলবে, আর সিলেটে চলবে না-এটা মেনে নেওয়া যাবে না।’ সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী’র এমন মন্তব্যে পাথর গলেছে সিলেটে কর্মবিরতি পালনকারী পরিবহন শ্রমিক ও পাথর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের। অনেকটা আশ্বস্ত হয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পরিবহন ধর্মঘট নিয়ে সংকট নিরসনে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও পরিবহন নেতাদের নিয়ে দীর্ঘ বৈঠকে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও আবেগঘন বক্তব্য দেন বিভাগীয় কমিশনার। তিনি বলেন, সিলেট কোনো বিচ্ছিন্ন ভূমি নয়। সিলেটের জন্য আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি মেনে নেওয়া যাবে না। সারাদেশে পাথর কোয়ারি চলবে, আর সিলেটে চলবে না, এটা মেনে নেওয়া যাবে না। তিনি বলেন, যেখান থেকে যে সিদ্ধান্ত দেওয়া হোক না কেন, রিভিউ করার সুযোগ আছে। নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতে গিয়ে যদি রিভিউ করার সুযোগ থাকে, তাহলে প্রশাসনিক আদেশেরও রিভিউ হতে হবে।
বিভাগীয় কমিশনার বলেন, ‘আমরা এই বিষয়গুলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবো। এই অন্তর্বতীকালীন সময়ে আমরা কী করবো আর কী করবো না, তা সিদ্ধান্ত নিয়ে আপনাদেরকে জানাবো। আমরা কখনও জনগণের প্রতিপক্ষ ছিলাম না। জুলাই আগস্টেও আমরা জনগণের পক্ষে ছিলাম। সব সময় জনগণের পক্ষে থাকবো।‘
রেজা-উন-নবী আরও বলেন, আজকের বৈঠকের সকল বিষয়গুলো একত্রে করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় এমনকি প্রধান উপদেষ্টার কাছেও পৌঁছানো হবে। কারণ উপদেষ্টারা বিচ্ছিন্নভাবে সিদ্ধান্ত দেন তাহলে আমরা সর্বোচ্চ জায়গায় চলে যাবো। সবাইকে নিয়ে বসে একটা সিদ্ধান্তে আসা হবে।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র হলো জনগণের স্বার্থে। জনগণ না বাঁচলে রাষ্ট্রের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না। জনগণ অভুক্ত থাকলে রাষ্ট্র কি করলো না করলো তাতে কোনো কিছু যায় আসে না। জনগণ সবার উপরে।
তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি সিলেটে দুইজন উপদেষ্টা এসেছিলেন। আমার সিলেটের সমস্যাগুলো তাদেরকে জানিয়েছি। কিন্তু আপনাদের মতো স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে বসা গেলে তাঁরা সমস্যাগুলো অনুভব করতেন। রাজধানীতে বসে গ্রামের মানুষের কষ্ট বোঝা যায় না। রাজপ্রাসাদে বসে সাধারণ মানুষ কীভাবে জীবনযাপন করে অনেকেই তা বুঝেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘পাথর তুললে যেমন ক্ষতি, না তুললেও ক্ষতি। এই জন্য পাথর সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করতে হবে। তাদেরকে প্রচুর স্টাডি করতে হবে। এখনকার মানুষের জীবন ও জীবিকার বিষয়টি ভাবতে হবে। রাষ্ট্রের অনেক বিষয় দেখার আছে। রাষ্ট্রকে এগুলো বুঝতে হবে।‘
নিয়মতান্ত্রিকতার বাইরে গিয়ে পাথর উত্তোলন করায় সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলন বাতিল হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, নিয়মের বাইরে বেশি খনন হয়েছে, বোমা মেশিন ব্যবহার করা হয়েছে। যে কারণে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমরা যদি নিয়ম মেনে সনাতন পদ্ধতিতে পাথর তুলতে পারি তাহলে বিষয়গুলো নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া যাবে। তবে গণমানুষ ও শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকার বিষয়টি মাথায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।‘
তিনি বলেন, ‘মানুষ কী প্রকৃতি-পরিবেশের বাইরে। মানুষ না বাঁচলে প্রকৃতি-পরিবেশ বাঁচলে কী লাভ আছে। আমি সব সময়ই আপনার বালু আছে, পাথর আছে, প্রকৃতি আছে, কিন্তু মানুষ নাই। মানুষ নাই, আপনার সব আছে। আমার তো দেশই নাই। আমার তো কিছুই নাই। এজন্য ফোকাসটা জায়গা মতো দিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজকের মিটিংয়ের সকল বিষয় রেজুলেশন হবে। লিখিতভাবে সকল বিষয় মন্ত্রণালয়ে ও সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হবে। জ্বালানি, খণিজসম্পদ মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রয়োজনে সিলেটে মিটিং হবে। আপনাদের সেখানে রাখা হবে।’
বিভাগীয় কমিশনার বলেন, ‘বাস মিনিবাসের ক্ষেত্রে ২০ বছর ও ট্রাক, পিকাপ, কাভার্ডভ্যানের ক্ষেত্রে ২৫ বছর ইকোনোমিক লাইফ নির্ধারণ করার আইন এখন প্রয়োগ করা হচ্ছে না। আইন মানুষের জন্য আইনের জন্য মানুষ নয়। প্রয়োজন হলে আইন সংশোধন হবে, সরকারের নীতি পরিবর্তন হবে। কিন্তু মানুষ সবার উপরে। মানুষকে বাদ দিয়ে সরকারের কোনো নীতি প্রয়োগ হতে পারে না। এগুলো নিয়ে বিআরটিএ‘র সঙ্গে কথা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিআরটিএ-এর আগের চেয়ারম্যানকে এই বিষয়ে আরও আগে জানানো হয়েছে। নতুন চেয়ারম্যানকেও আবার বিষয়টি জানাবো। প্রয়োজনে তাঁকে সিলেট আসার অনুরোধ জানাবো। যাতে করে তিনি সিলেটে এসে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়ে যান।’
প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, মহানগর জামায়াতের আমীর মো. ফখরুল ইসলামসহ প্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তা এবং পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতৃবৃন্দ।
সিলেটের জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহার ছাড়াও পরিবহন শ্রমিকদের ৬ দফা দাবির মধ্যে ছিল-সড়ক পরিবহন আইন ২-১৮ এর ৩৬ ধারা প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার বাস মিনিবাসের ক্ষেত্রে ২০, ট্রাক পিকআপ কাভার্ডভ্যানের ক্ষেত্রে ১৫ ও সিএনজি ইমা ও লেগুনার ক্ষেত্রে ১৫ বছর ইকোনোমিক লাইফ নির্ধারণ করার প্রজ্ঞাপন বাতিল, সিলেটের সব পাথর কোয়ারির ইজারা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার ও সনাতন পদ্ধতিতে বালু মহাল এবং পাথর কোয়ারি খুলে দেওয়া, বিআরটিএ কর্তৃক গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট প্রদানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র বাতিল ও গণপরিবহণের উপর আরোপিত বর্ধিত ট্যাক্স প্রত্যাহার, সিলেটের সব ক্রাশার মিলের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ বন্ধ, বিদ্যুতের মিটার ফেরত ও ভাঙচুরকৃত মিলের ক্ষতিপূরণ এবং গাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া পাথর-বালুর ক্ষতিপূরণ, সিলেটের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদকে প্রত্যাহার এবং বালু পাথরসহ পণ্যবাহী গাড়ির চালকদের হয়রানি না করা।




