পুরনো চেহারায় কি ফিরবে দুইশ’ বছরের পুরনো মাছুদিঘী?
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৬ আগস্ট ২০২৫, ১০:০৩:৫৩ অপরাহ্ন
আহমাদ সেলিম :
ইতিহাসে মাছুদিঘীর নাম আছে, কিন্তু বাস্তবে অস্তিত্বহীন। কচুরিপানা, আবর্জনার নিচে পড়ে থাকা দুইশ’ বছরের পুরনো সেই দিঘী পরিষ্কার করা হচ্ছে। এলাকার মানুষও সেই দিঘীর পুরনো চেহারা ফিরে পেতে জেগে উঠেছেন, দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন।
এক সময় সিলেট নগরীতে অসংখ্য পুকুর এবং দিঘী ছিল, তবে অধিকাংশই ভরাট হয়ে গেছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) জরিপে নগরীতে ৩৬টি পুকুর এবং দিঘীর (যখন ২৭টি ওয়ার্ড ছিলো) অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তবে নগর বর্ধিত হয়ে ৪২টি ওয়ার্ড হবার পর, সেই হিসাব বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু, সঠিক হিসেব কারো কাছে পাওয়া যায়নি। এমনকি সিটি কর্পোরেশনের কাছেও নেই। সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী পুকুর দিঘীর হিসেব স্পষ্ট করার জন্য ৬ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটিও গঠন করেছিলেন। সেটি আলোর মুখ দেখেনি।
এদিকে, ৩৬টির মধ্যে অধিকাংশ পুকুর-দিঘী ভরাট হয়ে গেছে। তবে এখনো মুমূর্ষু অবস্থায় টিকে থাকা অন্যতম বড় একটি দিঘীর নাম মাছুদিঘী। তেরো নম্বর ওয়ার্ডে দিঘীটির অবস্থান। এক সময় মাছুদিঘীরপাড় ছাড়াও আশপাশের বেশ কয়েকটি পাড়ার মানুষের জীবনের অংশ ছিলো দিঘীটি। শীত মৌসুমে নানা প্রজাতির পাখির অভয়াশ্রয় ছিলো দিঘীর পরিবেশ। তবে বেশ কয়েকবছর ধরে দিঘীটি দখল, দূষণে তার অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। প্রায় ৯ কেদার সীমানা নিয়ে গঠিত দিঘীর অন্তত ৪ কেদারই ভরাট হয়ে গেছে।
প্রবীণদের দেয়া তথ্যমতে, মাছুদিঘীর বয়স অন্তত দুইশ’ বছর। সিলেটের অন্যতম পুরনো এই দিঘীটিতে কিছুদিন ধরে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের অন্তত ৫০ জন সেবক সেই পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। যতই পরিষ্কার হচ্ছে, ততই যেন ইতিহাস জেগে উঠছে। মাছুদিঘীরপাড়ের বাসিন্দা মো. আলতাফ হোসেন লস্করের শৈশব কৈশোর কেটেছে দিঘীর পানির শব্দে। সাতাঁর শিখেছেন এই দিঘীতে। বলেন, ‘তখন রোববার ছিলো সাপ্তাহিক ছুটি। সবাই মিলে দিঘীতে সাতাঁর কাটতাম। পাড়ি দিতাম একপাড় থেকে অন্যপাড়। পাড়ের কিনারে কিলবিল করতো বালিয়াড়ি মাছ। সেই দিঘী এখন আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। বর্তমানে ময়লা আবর্জনায় ভরে গেছে দিঘী। তালতলাস্থ হোটেল ইস্টএন্ড হোটেলটির সুয়ারেজ পাইপ লাইনটির সংযোগ দিঘীতে দেয়া হয়েছে। আমরা তাদের বিরুদ্ধেও এগোচ্ছি।’
এলাকার বাসিন্দা মিনহাজ খান বলেন, ‘আমরা দিঘীটি পরিষ্কার রাখার দাবিতে লিখিতভাবে জানিয়েছি। সেই দাবিতে দিঘী পরিষ্কার কার্যক্রম চলছে। আমরা চাই, কুচক্রীমহল যাতে ভরাট করে কোনো স্থাপনা গড়তে না পারে, এর জন্য পুন:খননের দাবি জানিয়েছি।’
জাফর খান, রাসেল আহমদ, রিংকুসহ মাছুদিঘীর পাড়ের বেশ কয়েকজন তরুণ দিঘী রক্ষার দাবিতে ব্যাপক জনমত গড়ে তোলার পক্ষে কাজ করছেন। সুমন নামে এক তরুণ বলেন, দিঘীর চারপাশে অন্তত ১৫টির মতো ঘাট ছিলো। এখন ঘাটও নেই, দিঘীর অর্ধেকও নেই।’
দিঘীটি জঞ্জালমুক্ত করায় এলাকাবাসীর মতো পরিবেশবাদীদের মধ্যেও আশার সঞ্চার করেছে। ধরিত্রী রক্ষার জন্য আমরা(ধরা) সিলেট এর সদস্য সচিব সুরমা রিভার ওয়াটার কিপার আব্দুলকরিম কীম বলেন, ‘দিঘী পরিষ্কার হচ্ছে, এটি খুব ভালো খবর। এই কার্যক্রম যেন অব্যাহত থাকে।’ তিনি বলেন, ‘মালিকানা যে-ই থাকুক, আইনে পুকুর দিঘী ভরাট নিষিদ্ধ। জমির শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না। তারপরও সিলেট শহরের পুকুর, দিঘী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আমরা মাছুদিঘীরপাড়বাসীর সাথে আছি। আমরা চাই দিঘীটি পূর্বের চেহারায় ফিরে আসুক।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) সিলেট-এর প্রধান সমন্বয়ক এডভোকেট শাহ শাহেদা আখতার বলেন, ‘সিলেটের অন্যসব পুকুর দিঘীর মতো মাছুদিঘীর দিকেও আমাদের সুদৃষ্টি আছে। তবে এলাকার মানুষের মধ্যে আন্তরিকতার অভাব আছে। কখনো ডাকলে, সবাইকে এক সাথে পাই না। নইলে দিঘীটির এতো সর্বনাশ হতো না।’
যোগাযোগ করা হলে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার বলেন, পর্যায়ক্রমে সিলেটের সব দিঘী পুকুর নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে, আমরা শুধু পরিষ্কার করলে হবে না, এলাকার মানুষকেও আন্তরিক হতে হবে।




