দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভূ-রাজনীতি
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ জুলাই ২০২৬, ৪:২৯:৩৪ অপরাহ্ন
আরণ্যক শামছ :
দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সমীকরণ বরাবরই অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল। সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলের রাজনীতিতে নতুন এক গভীর টানাপোড়েন ও কৌশলগত মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য এক বড় পরীক্ষা।
বিশেষ করে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং লাইং-এর মধ্যকার শীর্ষ বৈঠকটি সমগ্র দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে এক বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই বৈঠকটি কেবল ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কোনো সাধারণ বা প্রথাগত ঘটনা নয়, বরং এটি বর্তমানের জটিল বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ, চীন, পাকিস্তান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক স্বার্থ ও দ্বন্দ্বের এক নতুন সমীকরণকে সামনে এনেছে।
মিয়ানমারে দীর্ঘকাল ধরে চলমান তীব্র গৃহযুদ্ধ, গণতন্ত্রের চরম সংকট এবং সেখানকার জান্তা সরকারের টিকে থাকার মরিয়া লড়াইয়ের মাঝে ভারতের মতো একটি বৃহৎ ও প্রভাবশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এই বিশেষ কূটনৈতিক পদক্ষেপকে বিশ্বের অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গভীর কৌশলগত চাল হিসেবে দেখছেন। এই ধরনের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির গভীরতম প্রভাব এবং তরঙ্গাঘাত সরাসরি এসে আছড়ে পড়ে বাংলাদেশের ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত সীমানায়, যা ঢাকাকে এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
মিয়ানমার বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম প্রধান উপকেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যেখানে বিভিন্ন পরাশক্তির স্বার্থের সংঘাত প্রতিদিন আরও স্পষ্ট হচ্ছে। দেশটির সামরিক জান্তা প্রধান মিন অং লাইং এক অত্যন্ত বিতর্কিত ও জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রপতির পদে আসীন করার পর প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে ভারতকে বেছে নিয়েছেন। ভারতের পক্ষ থেকেও তাকে অত্যন্ত উষ্ণ, আনুষ্ঠানিক ও কৌশলগত অভ্যর্থনা জানানো হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
এই সফরের সবচেয়ে বড় কৌতূহল এবং আন্তর্জাতিক সমালোচনার জায়গাটি হলো, ভারত একটি সুপ্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও কেন মিয়ানমারের একটি অগণতান্ত্রিক, স্বৈরাচারী ও বিতর্কিত সামরিক সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে বৈধতা দেওয়ার এই বিতর্কিত পথ বেছে নিল।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক প্রবীণ কূটনীতিবিদদের মতে, ভারতের এই সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের পেছনে কাজ করছে সম্পূর্ণভাবে তাদের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ চালিত নীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এক গভীর বাস্তববাদী কৌশল। ভারত এখন আর মিয়ানমারে কে ক্ষমতার চূড়ায় বসে আছে বা দেশটির অভ্যন্তরীণ নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ ছিল, সেই আদর্শিক বা নৈতিক বিতর্কে সময় নষ্ট করতে একেবারেই রাজি নয়। তাদের কাছে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উত্তর-পূর্ব ভারতের সীমান্ত সুরক্ষা এবং সেখানে চলমান দীর্ঘমেয়াদী অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ ও বিচ্ছিন্নতাবাদকে নিয়ন্ত্রণ করা। এই পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের সীমান্ত ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর পড়বে, যা এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব।
ভারতের বাস্তববাদী কূটনীতি ও সীমান্ত সুরক্ষার অঙ্ক :
ভারতের বাস্তববাদী কূটনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো তার নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক আধিপত্য বজায় রাখা। মিয়ানমারের সাথে ভারতের প্রায় ষোলশত কিলোমিটারের দীর্ঘ, দুর্গম এবং পার্বত্য সীমান্ত রয়েছে, যা ঐতিহাসিকভাবেই অত্যন্ত সমস্যাসংকুল। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো, বিশেষ করে অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর ও মিজোরামের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও স্থিতিশীলতা সরাসরি মিয়ানমারের সীমান্ত পরিস্থিতির ওপর ওতপ্রোতভাবে নির্ভরশীল। এই অঞ্চলের উলফা বা বিভিন্ন নাগা এবং মেইতেই সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের গহীন অরণ্য, সীমান্ত এলাকা এবং জান্তা সরকারের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে তাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ও অপারেশনাল বেস হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল।
এই কঠিন পরিস্থিতিতে নরেন্দ্র মোদি সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল মিয়ানমারের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে এই মর্মে একটি সুদৃঢ় ও অলঙ্ঘনীয় প্রতিশ্রুতি আদায় করা, যেন মিয়ানমারের ভূখণ্ড কোনোভাবেই ভারত-বিরোধী কোনো শক্তির জন্য বা বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতার জন্য ব্যবহৃত না হয়। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং লাইং ভারতকে সেই আশ্বস্তবাণী দিয়েছেন এবং নিজেদের সীমান্ত সুরক্ষায় যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন। তবে এই আশ্বাসের বাস্তবায়ন মাঠ পর্যায়ে কতটা সম্ভব, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সামরিক বিশেষজ্ঞদের মনে এক বিরাট ও যৌক্তিক সংশয় রয়েছে।
এই সংশয়ের মূল কারণ হলো, বর্তমানে মিয়ানমারের প্রায় ষাট শতাংশ ভূখণ্ডই জান্তা সরকারের সম্পূর্ণ হাতছাড়া হয়ে গেছে এবং তা দেশটির বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের মতো গেরিলাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। যে জান্তা সরকারের নিজের দেশের ওপর, নিজের সেনাবাহিনীর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই এবং যার সৈন্যরা প্রতিদিন বিভিন্ন ফ্রন্টে মার খাচ্ছে, তার সীমান্ত সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি এক প্রকার প্রতীকী বা কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যের সিংহভাগ অঞ্চল এখন আরাকান আর্মির দখলে, যেখানে মিয়ানমার কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ অবশিষ্ট নেই। এই পরিস্থিতিতে ভারতের এই জান্তা-তোষণ নীতি বাংলাদেশের জন্য এক নতুন কূটনৈতিক বার্তার জন্ম দেয়। বাংলাদেশ বর্তমানে যে রাজনৈতিক ও কৌশলগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাতে এই ধরনের আঞ্চলিক জোট অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
মিয়ানমার ও ভারতের এই নতুন অক্ষ বা বোঝাপড়া বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে, কারণ বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের কারণে সৃষ্ট শরণার্থী সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। ভারতের এই পদক্ষেপ প্রকারান্তরে জান্তা সরকারকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা হিসেবে দেখা হতে পারে, যা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
বাংলাদেশের সীমান্ত সংকট ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জটিলতা:
মিয়ানমারে চলমান দীর্ঘমেয়াদী গৃহযুদ্ধের কারণে সবচেয়ে বড় মানবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে বাংলাদেশকে। রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত দমনপীড়ন, গণহত্যা এবং পরবর্তীতে আরাকান আর্মির সাথে তাদের রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী সংঘর্ষের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্তে।
এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি টেকসই সমাধান ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য জোরালো দাবি জানিয়ে আসছে, তখন ভারতের মতো একটি প্রধান ও প্রভাবশালী প্রতিবেশীর মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সাথে এই ধরনের গভীর সখ্যতা বাংলাদেশের জন্য নতুন এক সমীকরণ তৈরি করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারত এখানে একটি অত্যন্ত চতুর ও দ্বি-মুখী নীতি বজায় রাখছে, যা তাদের কৌশলগত স্বার্থকে রক্ষা করে। একদিকে তারা মিয়ানমারের মূল চালিকাশক্তি জান্তা সরকারের সাথে আনুষ্ঠানিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ রাখছে, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে তারা রাখাইন রাজ্যের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক ও শক্তিশালী মাঠ পর্যায়ের সংগঠন আরাকান আর্মির সাথেও এক ধরনের কৌশলগত বোঝাপড়া তৈরি করার চেষ্টা করছে। কারণ ভারত ভালো করেই জানে, তাদের নিজস্ব অর্থায়নে গড়ে তোলা কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট প্রজেক্ট এবং সিতওয়ে বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে জান্তা সরকারের পাশাপাশি রাখাইনের মূল শক্তিগুলোর সাথে সুসম্পর্ক রাখা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই নীতিগত বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, তবে ঢাকার জন্য এই ভারসাম্য রক্ষা করা অনেক বেশি কঠিন। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালন করা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত সমাধানের যে সব আশাবাদ অতীতে ব্যক্ত করা হয়েছে, তার বাস্তবায়ন এই জটিল আঞ্চলিক কূটনীতির কারণে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।
বর্তমান মিয়ানমার সেনাবাহিনী বা জান্তা সরকার তীব্র জনবল, অর্থনৈতিক ও নৈতিক সংকটে ভুগছে। তাদের হাজার হাজার সোলজার হয় নিহত হয়েছে, না হয় যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে গেছে অথবা প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। অর্থনৈতিকভাবেও জান্তা সরকার দেউলিয়া হওয়ার পথে, তারা নিজেদের সৈন্যদের ঠিকমতো বেতন ও রসদ পর্যন্ত দিতে পারছে না। এইরকম একটি ভঙ্গুর ও বিশৃঙ্খল সামরিক শক্তির ওপর ভরসা করে বাংলাদেশ যদি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আশা করে, তবে তা হবে চরম ভুল এবং দীর্ঘমেয়াদে তা বাংলাদেশের জন্য আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।
ওয়াশিংটনের ছক বনাম বেইজিংয়ের রেড লাইন:
মিয়ানমার সংকট ও দক্ষিণ এশিয়ার এই ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় এবং বিপজ্জনক যে দ্বন্দ্বটি দৃশ্যমান হচ্ছে, তা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যকার বৈশ্বিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান বিশ্বে তার একক পরাশক্তি হিসেবে অবস্থান ধরে রাখতে এবং এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাবকে প্রতিহত করতে এই সামগ্রিক অঞ্চলটিকে একটি নতুন ভূরাজনৈতিক রণক্ষেত্রে পরিণত করার চেষ্টা করছে বলে অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করেন।
ওয়াশিংটনের মূল কৌশল হলো, মিয়ানমারের জান্তা সরকারের পতন ঘটানোর জন্য সেখানকার গণতন্ত্রকামী শক্তি এবং জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ, অস্ত্র ও লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া। কিন্তু এর পেছনে তাদের আরেকটি সুদূরপ্রসারী ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে, যা বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত প্রবেশদ্বার এবং মিয়ানমারের খনিজ সম্পদে ভরপুর রাখাইন অঞ্চলে নিজেদের এক ধরনের পরোক্ষ সামরিক বা কূটনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এর মাধ্যমে তারা চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং চীনের তৈরি করা বিকল্প জ্বালানি করিডোরকে চিরতরে অবরুদ্ধ বা অকার্যকর করতে চায়।
কিন্তু এই মার্কিন নীতি বা আমেরিকান গেম এই অঞ্চলের স্থায়ী শান্তির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। সুবীর ভৌমিকের মতো প্রবীণ আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত স্পষ্ট ও কড়া ভাষায় সতর্ক করেছেন যে, বাংলাদেশ যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা এই ভূরাজনৈতিক ছকে পা দেয় এবং তাদের কথামতো এই অঞ্চলের নীতি নির্ধারণ করে, তবে বাংলাদেশের জন্য চরম বিপদ অপেক্ষা করছে।
ভবিষ্যৎমুখী ভবিষ্যদ্বাণী ও বাংলাদেশের ভারসাম্য কূটনীতি:
এই সামগ্রিক এবং অত্যন্ত জটিল আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিশেষ করে তারেক রহমানের সম্ভাব্য সরকারকে এক বিশাল ভূরাজনৈতিক অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। তারেক রহমান দীর্ঘদিন লন্ডনে প্রবাস জীবন কাটানোর পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার দল যখন একটি শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে আসছে, তখন তাকে অত্যন্ত পরিপক্ক, দূরদর্শী ও বাস্তবমুখী কূটনীতির পরিচয় দিতে হবে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতিপূর্বে তারেক রহমানকে ভারতে আসার জন্য আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, যা ছিল ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের একটি বড় ধরনের ইতিবাচক জেসচার। কিন্তু সেই সফরটি এখনো নানা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ, অভ্যন্তরীণ চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যদিয়ে ব্যর্থ হলো। তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তিন নৌকায় পা দিয়ে চলার এই বিপজ্জনক ও ভঙ্গুর নীতি থেকে বের হয়ে আসা।
বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমীকরণে দেখা যাচ্ছে যে, তাদের এক পা রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে, এক পা রয়েছে বেইজিংয়ে এবং অন্য পা দিয়ে তারা নয়াদিল্লির সাথে সম্পর্ক জোড়া লাগাতে চাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কোনো টেকসই সমাধান দিতে পারে না। ভূরাজনীতির অলিখিত নিয়মানুযায়ী, একসাথে এতগুলো পরাশক্তি ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে বাংলাদেশ এক বড় ধরনের কৌশলগত ফাঁদে বা জাঁতাকলে পিষ্ট হতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা যেমন চীন ও ভারতকে ক্ষুব্ধ করবে, তেমনি চীনকে অতিরিক্ত সুবিধা দিলে ভারত ও আমেরিকা যৌথভাবে বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সরকারকে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এবং জাতীয় স্বার্থকে সবার ওপরে রেখে একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অথচ বাস্তবমুখী পররাষ্ট্র নীতি গ্রহণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জন্য একমাত্র নিরাপদ, টেকসই ও কল্যাণকর পথ হলো ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ এই নীতিকে বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর জটিল বাস্তবতায় নতুন করে সংজ্ঞায়িত ও প্রয়োগ করা। বাংলাদেশকে বুঝতে হবে যে, ভৌগোলিক বাস্তবতাকে কখনো পরিবর্তন করা যায় না; বন্ধু পরিবর্তন করা যায় কিন্তু প্রতিবেশী নয়।
আমেরিকা আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে অনেক দূরে অবস্থিত, কিন্তু ভারত ও মিয়ানমার বাংলাদেশের চিরস্থায়ী প্রতিবেশী। প্রতিবেশীকে অশান্ত রেখে বা প্রতিবেশীর সাথে যুদ্ধাবস্থা তৈরি করে কোনো দেশ শান্তিতে থাকতে পারে না।
পরিশেষে বলা যায়, ভারত-মায়ানমার অক্ষ দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির যে পরিবর্তিত বাস্তবতাকে আমাদের সামনে উন্মোচন করেছে, তা বাংলাদেশের জন্য একাধারে একটি বড় সতর্কবার্তা এবং অন্যদিকে নিজেদের আঞ্চলিক নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার এক অনন্য সুযোগ।
বাংলাদেশকে স্পষ্ট ও দৃঢ়ভাবে নয়াদিল্লি এবং বেইজিং উভয় পক্ষকেই আশ্বস্ত করতে হবে যে, বাংলাদেশের ভূখণ্ড কোনো তৃতীয় শক্তির স্বার্থে বা প্রতিবেশীদের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে না। পরাশক্তিগুলোর চাপ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণের এই কঠিন ঝড়ো হাওয়ার মধ্যেও বাংলাদেশ যদি তার কূটনৈতিক কম্পাসটিকে সঠিক দিকে ধরে রাখতে পারে, তবেই কেবল এই ভূরাজনৈতিক মহাসংকট থেকে দেশ নিজেকে রক্ষা করতে পারবে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি, স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদী সমৃদ্ধির এক নতুন দিগন্তের সূচনা হবে।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক।



