শ্রদ্ধাঞ্জলি
বেগম খালেদা জিয়া : বাংলাদেশের ‘নীলকন্ঠ পাখি’
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, ৮:৪৫:৪১ অপরাহ্ন
মুহাম্মদ তাজ উদ্দিন :
আহা। কী রাজসিক বিদায়। একটি সফল জীবনের কী অপরূপ পরিসমাপ্তি। একজন সাধারণ গৃহবধু থেকে দেশনেত্রী হয়ে ওঠার এক অসাধারণ মহাকাব্যের নাম বেগম খালেদা জিয়া। সৎ, সাহসী দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রপ্রধানের সহধর্মিনী থেকে জন-আকাঙ্খার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠার এক অন্যন্য উপন্যাস।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন হঠাৎ করেই তার প্রিয় দেশবাসীকে ছেড়ে গেলেন, তখনই দিশেহারা দেশবাসীর সামনে তিনি আবির্ভূত হলেন ‘লাইট হাউজ’ হিসেবে। দিকহারা বাংলাদেশের পাঞ্জেরি হিসেবে দেখা দিলেন। দেশবাসীর আস্থা, বিশ্বাস আর ভালবাসার প্রতীক হয়ে উঠলেন তিনি। দেশমাতৃকার প্রতি তাঁর বিশ্বস্ততার জন্য এদেশের মানুষ ভালবেসে তাকে ‘আপোসহীন নেত্রী’র অভিধায় ভূষিত করলো। তার নামের সাথে যুক্ত হলো- দেশনেত্রী।
শহীদ জিয়া বিশ্ব ইতিহাসের একমাত্র ব্যক্তি যিনি নিজে সেনাপ্রধান হয়েও তার দেশবাসীকে গণতন্ত্র উপহার দিয়েছিলেন। ১৯৮১ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠার মাত্র ৪ বছরের মাথায় শাহাদতবরণ করেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। স্বামী হারানোর মাত্র একবছরের মাথায় হাল ধরলেন বিএনপির। স্বৈরাচারী এরশাদ তখন গণতন্ত্রের টুটি চেপে ধরেছিল। দেশবাসী তখন নতুন নেতৃত্বের আশায় চাতক পাখির মত চেয়ে আছে। ঠিক সে সময় রাষ্ট্রপতির সহধর্মিনীর পরিচয় ছাপিয়ে নিজেকে অন্যরকম দ্যোতনায় মেলে ধরলেন বেগম খালেদা জিয়া।
১৯৮২ সাল থেকে রাজপথ ছিল তাঁর ঠিকানা। দীর্ঘ ১০ বছর স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে এদেশের প্রতিটি ধুলিকনায় নিজের পরিচয়টাকে ছড়িয়ে দিলেন ‘দেশনেত্রী’ হিসেবে। তাঁর বলিষ্ট নেতৃত্বে স্বৈরাচারী এরশাদের পতন হলো। দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর পরই দেশের মানুষ আবারো তাঁর নেতৃত্বের প্রতি আস্থার রাখলো। ১৯৯১ সালে জাতিকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাকেই বেছে নিল পুরো বাংলাদেশের মানুষ।
১৯৯৬ সালে আবারো ছন্দপতন। এবার ভিন্নরূপে তিনি। বিদেশী শক্তির মদদে দাসত্ববাদীরা ক্ষমতায় এলো। আবারো বেগম খালেদা জিয়ার ঠিকানা হলো রাজপথ। সেই আন্দোলনে বারবার তাঁর প্রতি প্রলোভন এলো- হুমকি এলো দেশ ছাড়ার। কিন্তু, সকল হুমকি আর প্রলোভনের মুখে তিনি হিমালয়সম দৃঢ়তা নিয়ে দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে একচুল বিচ্যুত হলেন না। দেশের মানুষ তাই ভালবেসে তাকে ডাকলো ‘আপোসহীন নেত্রী’।
এদেশকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খুঁজে খুঁজে বের করে এনেছিলেন একেকটি হিরক খন্ড। এম সাইফুর রহমান, একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, বিএম আব্বাস, ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ, ড. আব্দুল মঈন খান, ড. মোশারফ হোসেনের মত বিদ্বান ও দেশপ্রেমিক মানুষদেরকে নিয়ে বাংলাদেশে এক উন্নয়নের অভিযাত্রা শুরু করেছিলেন। শহীদ জিয়ার এই আস্থাভাজনদের নিয়েই বেগম খালেদা জিয়া একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বা বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি এম ইলিয়াস আলীর মত দেশপ্রেমিক তরুণদেরকে তৈরি করেছিলেন আগামীর নেতৃত্বের জন্য। তার বলিষ্ট নেতৃত্বে দেশের অর্থনীতিতে হয়েছিল নতুন দিগন্তের সূচনা।
ওয়ান ইলেভেনের নাটকীয় পটপরিবর্তনের পর তাঁর সন্তানদেরকে যেভাবে নির্যাতনের করা হচ্ছিল, তখন একজন মা হিসেবে মুষড়ে পড়ার কথা ছিল বেগম জিয়ার। ছোট ছেলে আরাফাত কারাগারে নির্যাতন সহ্য করতে পেরে চোখের সামনে মারা গেলেন।
বড় ছেলেকে এমন নির্যাতন করা হলো যে তিনি হাঁটা চলার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেললেন। বারবার বেগম জিয়াকে বলা হলো, তিনি যদি দেশ ছেড়ে চলে যান, তাহলে তার ছেলেদের ছেড়ে দেয়া হবে। কিন্তু, নিজের প্রাণপ্রিয় সন্তানদের জীবন সংশয় সত্বেও আপোসহীন ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া, বললেন- বাংলাদেশের বাইরে আমার কোন ঠিকানা নেই। আমি বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাব না। যেদিন তার বাসার সামনে বালির ট্রাক দিয়ে তার গণতন্ত্রের জন্য রোড মার্চটিকে আটকে দেয়া হলো, সেদিন তিনি ছিলেন একান্তই একাকী। বাংলাদেশের একটি পতাকা হাতে নিয়ে সে রাতে নিজের বাড়ির সামনে এক ঘন্টা দাঁড়িয়ে তিনি যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, সেটি যারা শুনেছেন, তারাই বুঝতে পারবেন কতটা সাহসী আর দৃঢ়চেতা ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া।
আশি বছরের একটি পরিতৃপ্ত ও পূর্ণাঙ্গ জীবন শেষে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া পাড়ি জমালেন অনন্তলোকের পথে। আজ থেকে শতবর্ষ পরে যদি বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস লেখা হয়, তাহলে গোল্ডামেয়ার, বন্দনায়েকে, মার্গারেট থেচার, বেনজির ভূট্টো বা সুশীলা কার্কির মত মহিয়সী নারীদের নামের সাথে উচ্চারিত হবে বেগম খালেদা জিয়ার নাম। কারণ, তিনি এমন এক ক্রান্তিলগ্নে একটি জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, যারা নবীন হিসেবে গণতন্ত্রের পথে হাঁটছিল। আবার ইরানের শিরিন এবাদী বা ভেনিজুয়েলার মারিয়া কোরিনার পাশেও বেগম জিয়ার নাম থাকবে। কারণ গণতন্ত্রের প্রতি তার অবিচল আস্থা তাকে সেই উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
একইভাবে, তলাবিহীন ঝুড়ির দেশকে অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে গড়ে উঠার মত মনোবল আর রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির অবকাঠামো তৈরী করে দেয়ায় মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ বা সিঙ্গাপুরের লি কুয়ানের সাথেও বেগম খালেদা জিয়ার নামটি প্রতিধ্বনিত হবে।
বেগম জিয়া এদেশের মানুষের দুঃখ দুর্দশাকে নিজের জীবনের সাথে একীভূত করে নিয়েছিলেন। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তিনি ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা নিয়ে এদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের মুখপাত্রে পরিণত হয়েছিলেন। ফ্যাসিস্ট সরকারের গুম, খুন আর নির্যাতনের সবটুকু কষ্টকে তিনি যেন নিজের মাঝে আত্মস্থ করে নিয়েছিলেন- একটি নীলকন্ঠ পাখির মত।
পৌরানিক মতে- নীলকন্ঠ পাখিকে সৌভাগ্য সমৃদ্ধি, শুভ সূচনা ও অশুভ শক্তি বিনাসের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া সেই নীল কন্ঠ পাখি। তিনি যখনই দেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন তখনই দেশ উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে পরিচালিত হয়েছে। তার হাত ধরেই এদেশে উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের রাজনীতির শুভ সূচনা হয়েছে। তার বলিষ্ট নেতৃত্বেই এদেশে ফ্যাসিস্ট অপশক্তি বিনাস ঘটেছে।
‘উড়িয়া যাইবো সুয়া পাখি, পড়িয়া রইবো কায়া। বেগম খালেদা জিয়ার প্রাণপাখি উড়ে গেছে। কিন্তু, তার প্রতিটি নিঃশ্বাস ও প্রতিটি কাজ কালের সাক্ষী হয়ে সরবেই রয়ে যাবে। এদেশের প্রতিটি ধুলিকণার সাথে মিশে রবে তার মহৎ কীর্তিগুলো। পরম করুণাময় আল্লাহ বেগম খালেদা জিয়াকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকামে স্থান দিন— বিশ কোটি বাংলাদেশীর এটাই প্রার্থনা।
লেখক : আইনজীবী, সাংবাদিক।




