স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন # রাষ্ট্রপতির ভাষণকালে বিরোধীদের হট্টগোল ও ওয়াক আউট
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ মার্চ ২০২৬, ৫:৪৭:৪৩ অপরাহ্ন
ডাক ডেস্ক : এক নতুন অভিযাত্রার মধ্য দিয়ে শুরু হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। অন্তর্বর্তী সরকারের পথ পেরিয়ে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ২০ মাস পর ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম এ অধিবেশনের যাত্রা শুরু হয় গতকাল। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ও ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুর অনুপস্থিতিতে সংসদ সদস্যদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে প্রবীণ সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছেন।
সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে সংসদ অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সময়ে সরকার ও বিরোধী দলের সাংসদরা টেবিল চাপড়ে তাকে অভিনন্দন জানান। জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তারেক রহমান এই প্রথম সংসদ সদস্য হিসেবে প্রবেশ করেন।
অধিবেশন শুরুতে সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মাওলা কার্যক্রমের সূচনা করেন। তারপর বেলা ১১টা ৫ মিনিটে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। এরপর সূচনা বক্তব্য রাখেন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি একাত্তর সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত আন্দোলন সংগ্রামে সব শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
তারেক রহমান বলেন, ‘দেশনেত্রী খালেদা জিয়া জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন। স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে তিনি আপস করেননি।’
তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতিও শ্রদ্ধা জানান।
তারেক রহমান বলেন, দেশে কাক্সিক্ষত গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হলো। দলমত নির্বিশেষে তিনি দেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন। প্রতিটি পরিবারকে স্বনির্ভর করাই বিএনপির লক্ষ্য।
স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ায় কোনো বিরোধ থাকতে পারে না এবং বিরোধ নেই বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী । স্বনির্ভর বংলাদেশ গড়ায় এ সময় তিনি সবার সহযোগিতা চান।
সংসদ নেতাসহ অধিবেশন কক্ষ যখন ভরপুর সেই সময়টিতে স্পিকারের চেয়ার ফাঁকা ছিল। সংসদের প্রথম অধিবেশন বলে স্পিকারের চেয়ারের পাশে রাখা হয় রাষ্ট্রপতির চেয়ার।
সংসদ নেতা তারেক রহমান দাঁড়িয়ে সংসদ অধিবেশনকে সভাপতিত্ব করার জন্য প্রবীণ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে সভাপতি হিসেবে নাম প্রস্তাব করেন।
তারেক রহমানের প্রস্তাবে বিএনপির মহাসচিব, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পূর্ণ সমর্থন জানান।
এরপর জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাবকে সমর্থন জানান।
তিনি বলেন, ‘আমরা এই নামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি। তবে প্রস্তাবটি নিয়ে আগে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করলে ভালো হত।’
সাংসদরা টেবিল চাপড়ে তাতে সায় দিলে সরকারির দলের প্রথম সারি থেকে খন্দকার মোশাররফ হোসেন উঠে যান। এরপর অধিবেশন কক্ষ থেকে বের হয়ে হুইল চেয়ারে করে অধিবেশনের সভাপতিত্বে করতে চতুর্থ তলায় যান তিনি। এই সময়ে সভাপতির আগমন বার্তা ঘোষণা করা হয়।
বেলা ১১টা ২৫ মিনিটে স্পিকারের খন্দকার মোশাররফ হোসেন স্পিকার আসনে বসার পর সাংসদরা টেবিল চাপড়ে তাকে অভিবাদন জানান।
সংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি এই অধিবেশন আহ্বান করেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের গেজেট ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হওয়ার পর নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যেই এই অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছে। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি এ অধিবেশন শুরু করেন।
এবারের সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংসদ নেতা হিসেবে অধিবেশনে সরকারি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
অন্যদিকে, শক্তিশালী বিরোধীদলের ভূমিকায় রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বিরোধী দলের নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে যা এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
এদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ছাড়াও ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, পোপ ফ্রান্সিসের প্রতি শোক প্রস্তাব আনা হয়। এ ছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরীসহ ৩১ জন সাবেক সংসদ সদস্যের প্রতি শোকপ্রস্তাব আনা হয়।
এ সময় বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, শোকপ্রস্তাবটি একপেশে। তিনি মতিউর রহমান নিজামী, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, শরিফ ওসমান হাদিসহ বিভিন্ন নেতাদের প্রতি শোকপ্রস্তাব আনার দাবি জানান। এই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা শেষে শোকপ্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
শোক প্রস্তাবে উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গ এবং জুলাই শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয় । এরপর, জাতীয় সংসদে দোয়া পরিচালনা করেন সরকারের ধর্মমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসনে জয়লাভ করে ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছে, যার মধ্যে বিএনপি এককভাবে পেয়েছে ২০৯টি আসন। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন, যার মধ্যে জামায়াত এককভাবে ৬৮টি আসনে জয়ী হয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন
এদিকে, জাতীয় সংসদে স্পিকার পদে নির্বাচনের জন্য একটিমাত্র মনোনয়ন পেয়েছেন বলে সভাপতি খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানান। তিনি হলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী সংসদ সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি এই দায়িত্বপালনে সম্মত আছেন বলে জানান সভাপতি।
তিনি প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য প্রধান হুইপ সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম মনির প্রতি আহ্বান জানান। তিনি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাব সমর্থন করেন খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রকিবুল ইসলাম।
প্রস্তাব সংসদে উত্থাপন করা হয়। এতে হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়।
খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, “সর্বসম্মতিক্রমে ও বিনা প্রতিদ্বন্দি¦তায় ত্রয়োদশ সংসদ অধিবেশনের স্পিকার নির্বাচিত হলেন ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য হাফিজ উদ্দিন আহমদ।”
এরপর আসে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পালা।
এই পদে একটিমাত্র মনোনয়ন পেয়েছেন বলে জানান সভাপতি খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি হলেন- নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী কায়সার কামাল। তিনি এই দায়িত্বপালনে সম্মত বলেও জানান সভাপতি।
তিনি প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য সংসদের হুইপ নাটোর-২ আসনে সংসদ সদস্য রুহুল কুদ্দুস তালুকদারকে আহ্বান জানান। প্রস্তাব সমর্থন করেন হুইপ লক্ষীপুর-৪ আসনের সাংসদ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান। প্রস্তাবটি সংসদে পেশ করা হয়। এতে হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়।
খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, “সর্বসম্মতিক্রমে ও বিনা প্রতিদ্বন্দি¦তায় ত্রয়োদশ সংসদ অধিবেশনের ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হলেন সংসদ সদস্য ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী কায়সার কামাল।”
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর সভাপতি খন্দকার মোশাররফ হেসেন অধিবেশন আধা ঘন্টার জন্য মূলতবি করে অধিবেশন থেকে সালাম জানিয়ে বিদায় নেন।
পরে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারদের শপথ পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুরু, বিরোধীদের হট্টগোল ও ওয়াক আউট
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ঘোষণা দেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। এ সময় বিরোধী দলের সদস্যরা উঠে দাঁড়িয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে উচ্চকণ্ঠে এর বিরোধিতা করেন। পরে স্পিকার তাদের ধৈর্য্য ধরে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য শোনার অনুরোধ জানান। পরে রাষ্ট্রপতি অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করার পরও তারা বসে থেকে প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে প্রতিবাদ জানান। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ভাষণ দেওয়া শুরু করার পরও বিরোধীরা দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। এরপর, রাষ্ট্রপতি ভাষণ শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে বিরোধীরা ওয়াক আউট করেন।
রোববার সকাল পর্যন্ত সংসদ অধিবেশন মুলতবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আগামী রোববার সকাল ১১টা পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে। জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষে এই ঘোষণা দেন। এর আগে, রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষে দাঁড়িয়ে জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষ হয় এবং তিনি অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের সরকার পতনের আগে সবশেষ সংসদ অধিবেশন শেষ হয়ে ২০২৪ সালের ৩ জুলাই। সেটি ছিল বাজেট অধিবেশন, যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন ও পাস করা হয়। ৩০ জুন বাজেট বাজেট পাসের পর ৩ জুলাই ওই অধিবেশন শেষ হয়।
এরপর ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার কাজ এগিয়ে নেওয়ার পর ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আয়োজন করে। ভোটে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেন ১৭ ফেব্রুয়ারি।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদে দেওয়া ক্ষমতাবলে এ অধিবেশন আহ্বান করেন। সংসদ সচিবালয় পরে আনুষ্ঠানিকভাবে সূচি প্রকাশ করে।
এটি ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন হওয়ার পাশাপাশি ২০২৬ সালেরও প্রথম অধিবেশন। সংসদীয় রীতিতে বছরের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি। এই ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব ও আলোচনা হয়।




